রিমান্ড শেষে গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা কারাগারে
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনকে (১৯) আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় রিমান্ড শেষে প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদা ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রিমান্ড শেষে মাকছুদা আক্তারকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেনের আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। এক দিনের জিজ্ঞাসাবাদে আসামি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন জানিয়ে তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়।
আদালতে পেশ করা আবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মামলা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা মামলার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিকে জেলহাজতে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন। বিষয়টির ওপর আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকার ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই রাতেই সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং নিহতের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
গত ২১ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার দুই আসামিকে শেরেবাংলা নগর থানা থেকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত গাজী নজরুল ইসলামকে চার দিন এবং মাকছুদা বেগমকে এক দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাদী এস এম মাসুম বিল্লাহ পেশায় একজন মুদি দোকানদার। তার বড় মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে গত জুন মাসে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী ৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে মরিয়ম তার স্বামী ও সতীন মাকছুদার সঙ্গে ন্যাম ভবনের ওই বাসায় বসবাস করে আসছিলেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, মরিয়মের মামা মো. ওবায়দুর রহমানের (৩৮) প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় এই বিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে তার স্বামী ও সতীন শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে আসছিলেন। মরিয়মও মুঠোফোনে বিভিন্ন সময়ে পরিবারকে নির্যাতনের কথা জানান।
ঘটনার দিন ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নজরুল ইসলাম বাদীকে ফোন করে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখতে পান, ভেতর থেকে কক্ষের দরজা বন্ধ রয়েছে। পরে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে মরিয়মের বিছানা থেকে তার নিজের হাতে লেখা কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করে পুলিশ। তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার ফজলুল করিম জানান, কক্ষটি থেকে মরিয়মের লেখা চিরকুট পাওয়া গেছে।
এজাহারে উদ্ধার করা চিরকুটের বরাত দিয়ে বলা হয়, মরিয়ম তাতে লিখেছেন: 'শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই...। আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম, তার সাথে জিততে পারিনি, হেরে গেলাম ময়দানে।'
চিরকুটের অপর অংশে লেখা ছিল: 'যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমি তো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি, তুমি জিতেছ; কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছ।'
বাবা মাসুম বিল্লাহর দাবি, আসামি ওবায়দুর রহমানের প্ররোচনায় বিয়ে এবং পরবর্তীকালে স্বামী ও সতীনের ধারাবাহিক নির্যাতন ও প্ররোচনার মুখেই বাধ্য হয়ে তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুলাই মাসে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের 'ব্যক্তিগত মুহূর্তের' কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। এর পর গত ২২ জুলাই সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দলীয় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বহিস্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকেও অবহিত করা হয়।
