আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা: এমপি গাজী নজরুলের ৪ দিন ও তার প্রথম স্ত্রীর ১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় করা মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং তার প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদা ইসলামের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। আগামী সাত দিনের মধ্যে এ রিমান্ড কার্যকর করার জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত এই আদেশ দেন।
এর আগে, মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শামসুজ্জোহা সরকার আসামিদের আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা রিমান্ড আবেদনের পক্ষে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে বলেন—
১. আসামিদের এই মামলার বিষয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা সুকৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
২. ভিকটিম মরিয়ম গলায় ফাঁস দেওয়ার সময় আসামিরা বাসায় উপস্থিত ছিলেন; ফলে আত্মহত্যার পেছনে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্ররোচনা ছিল কি না তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
৩. ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, উসকানি, মানসিক চাপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অন্য কোনো উপায়ে আত্মহত্যায় সহায়তা করার ক্ষেত্রে আসামিদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা উদঘাটন করা।
৪. মামলার পলাতক আসামি গাড়িচালক ওবায়দুল ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তার অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা।
৫. ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি বা আসামি জড়িত রয়েছে কি না তা শনাক্তসহ ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রকৃত সত্য ও মূল রহস্য উদঘাটন করা।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে শুনানিতে বলেন, ঘটনার সময় নজরুল ও তার স্ত্রী বাসায় উপস্থিত ছিলেন। ঘটনার আগে তিনি ভিকটিমকে ট্রাপে ফেলে বিয়ে করেন। বিয়ে করার পর তিনি ও তার প্রথম স্ত্রী মিলে ভিকটিমকে মানসিক নির্যাতন করতেন, যার প্রমাণ মেলে সুইসাইড নোটে। তাই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য তাদের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।
অপরদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান রিমান্ড বাতিল ও জামিন প্রার্থনা করে শুনানিতে বলেন, আসামি একজন সংসদ সদস্য। তিনি তার স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিবেন এমনটা হয় না। এছাড়া তিনি বয়স্ক ও অসুস্থ। এসব বিবেচনায় তার রিমান্ড বাতিল করে জামিনের প্রার্থনা করছি।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক গাজী নজরুলের চার দিন ও তার স্ত্রীর একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন এবং আগামী সাত দিনের মধ্যে তা কার্যকর করার নির্দেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দুপুর ২টা ২০ মিনিটে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে পুলিশের গাড়িতে করে আসামিদের সিএমএম আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। পরবর্তীতে বিকেল ৩টা ১১ মিনিটে তাদের এজলাসে তোলা হয়। এ সময় আসামি গাজী নজরুল ইসলাম তার আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেন, মামলার এজাহার পড়ে দেখেন এবং ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেন।
এর আগে নিহত তরুণীর বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় নজরুল ইসলামসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, স্বামী ও তার প্রথম স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং আসামিদের প্ররোচনার কারণে মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে দায়ের করা মামলায় অন্য দুই আসামি হলেন—নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদা ইসলাম (৬৫) এবং মরিয়মের মামা মো. ওবায়দুর রহমান (৩৮)।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, বাদী এস এম মাসুম বিল্লাহ পেশায় একজন মুদি দোকানদার। তার বড় মেয়ে মরিয়মের (১৯) সঙ্গে গত জুন মাসে গাজী নজরুল ইসলামের (৭৫) ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে হয়। বিয়ের পর মরিয়ম তার স্বামী ও প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদার সঙ্গে শেরেবাংলা নগর থানাধীন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকার ন্যাম ভবনের একটি বাসায় বসবাস করতেন।
এজাহারে বলা হয়, শ্যালক মো. ওবায়দুর রহমানের (৩৮) প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় মরিয়মের সঙ্গে নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই স্বামী ও সতীন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। এ বিষয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে পরিবারের সদস্যদের মুঠোফোনে জানাতেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নজরুল ইসলাম বাদীকে ফোন করে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। পরে তিনি ওই বাসায় গিয়ে দেখতে পান, একটি কক্ষে মরিয়ম ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ঝুলছেন। রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।
পরে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে মরিয়মকে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় দেখতে পান তারা।
ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে মরিয়মের বিছানা থেকে তার হাতে লেখা একটি চিরকুট উদ্ধার করে পুলিশ। তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার ফজলুল করিম বলেন, 'মরিয়ম যে কক্ষে থাকতেন, সেখান থেকে তার লেখা কিছু চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে।'
এজাহারে চিরকুটের বরাত দিয়ে বলা হয়, সেখানে মরিয়ম লিখেছেন: 'শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই...।' চিরকুটে তিনি আরও লেখেন, 'আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম, তার সাথে জিততে পারিনি, হেরে গেলাম ময়দানে।'
চিরকুটের আরেক অংশে তরুণী লিখেছেন, 'যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমি তো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি, তুমি জিতেছ; কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছ।'
মরিয়মের বাবা এজাহারে আরও অভিযোগ করেন, তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। পরে স্বামী ও তার প্রথম স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং আসামিদের প্ররোচনার কারণে মরিয়ম আত্মহত্যা করে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুলাইয়ে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে নজরুল ইসলামের 'ব্যক্তিগত মুহূর্তের' কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর পর ২২ জুলাই সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পাওয়ায় দলটির গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকেও অবহিত করা হয়।
