আমদানি করা চিপ থেকে সমন্বিত উৎপাদন: স্থানীয় পলিয়েস্টার চাহিদার ২১% মেটাচ্ছে মডার্ন সিনটেক্স
টিকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মডার্ন সিনটেক্স ২০০২ সালে মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মাধ্যমে পলিয়েস্টার ব্যবসায় যাত্রা শুরু করে। তখন তাদের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল মাত্র ১০ টন।
২০১৭ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় দৈনিক ১০০ টনে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪৬০ টন।
প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (ইঞ্জিনিয়ারিং) সফল বড়ুয়া টিবিএসকে জানান, বর্তমানে এই কারখানা দেশের পলিয়েস্টার পণ্যের চাহিদার প্রায় ২১ শতাংশ পূরণ করছে। বছরে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার টন পণ্য উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি রপ্তানি থেকে প্রায় ৩ কোটি ডলার আয় করছে।
শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশ থেকে পলিয়েস্টার চিপ আমদানি করে তা প্রক্রিয়াজাত করে ফিলামেন্ট সুতা তৈরি করত। এতে তুলনামূলক বেশি জ্বালানি খরচ হতো এবং উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ত।
পরে কন্টিনিউয়াস পলিমারাইজেশন পদ্ধতিতে দেশে পলিয়েস্টার চিপ উৎপাদন শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় তারা।
সফল বড়ুয়া জানান, ২০১৭ সালের দিকে সমন্বিত কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা শুরু হয়। জমির প্রাপ্যতা, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সুবিধার কারণে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, জার্মান প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে কারখানাটি গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে পলিথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি) চিপ, ফুললি ড্রন ইয়ার্ন, ড্র টেক্সচার্ড ইয়ার্ন এবং পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (পিএসএফ) উৎপাদন করা হয়।
সফল বলেন, সম্প্রসারণের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও ৩ দশমিক ৭৫ একর জমি নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ১২০টি বিশেষায়িত কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কারখানাটিতে বছরে ৭৮ হাজার ৭৫০ টন পিএসএফ, ৪৩ হাজার ৭৫০ টন পলিয়েস্টার ফিলামেন্ট সুতা এবং ৩৮ হাজার ৫০০ টন পিইটি চিপ উৎপাদন হয়।
বাংলাদেশে বছরে পিএসএফের চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন। পলিয়েস্টার সুতার চাহিদা আনুমানিক ৫ লাখ থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। আর পিএসএফের চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টন। এই চাহিদার বড় একটি অংশ এখনো আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়।
প্রতিষ্ঠানটি দেশের পোশাক ও বস্ত্র উৎপাদনকারীদের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদেরও পণ্য সরবরাহ করে। স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে আগে মূলত চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করা সিনথেটিক উপকরণের বিকল্প তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বছরে প্রায় ৬ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
সফল বড়ুয়া বলেন, 'দেশে উৎপাদন শক্তিশালী হলে আমদানিনির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে শিল্পের পরবর্তী ধাপের কার্যক্রমও আরও বৈচিত্র্যময় হবে।'
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে পলিয়েস্টারের চাহিদা বছরে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
পোশাক রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পলিয়েস্টার
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এখনো তুলার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তবে বিশ্ববাজারে পলিয়েস্টারসহ কৃত্রিম তন্তুর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
সফল বড়ুয়া জানান, পোশাক রপ্তানির পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হলে বাংলাদেশে পলিয়েস্টারের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
তিনি বলেন, 'প্রাকৃতিক তন্তুর বাইরে পলিয়েস্টার অন্যতম সস্তা ও সহজলভ্য বিকল্প। বাংলাদেশ যদি পোশাক খাত আরও সম্প্রসারণ করতে চায়, তাহলে পলিয়েস্টারের ব্যবহার বাড়াতেই হবে।'
তার ভাষ্যমতে, ভোক্তার পছন্দ ও ফ্যাশনের পরিবর্তনের কারণে কৃত্রিম তন্তুর চাহিদা বাড়ছে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক তন্তুর ব্যবহারে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
দেশে পলিয়েস্টার উৎপাদন বাড়লে কাঁচামালের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত হবে। এতে পলিয়েস্টারভিত্তিক বস্ত্র ও পোশাক উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগও আকৃষ্ট হতে পারে।
প্রতিযোগিতা ও নীতিসহায়তা
দেশীয় উৎপাদনকারীদের চীন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এসব দেশের উৎপাদকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও বড় পরিসরে উৎপাদনের সুবিধা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশি উৎপাদনকারীদের আরও নীতিসহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন সফল।
তিনি জানান, বর্তমানে পুনর্ব্যবহৃত পলিয়েস্টার উৎপাদনকারীরা রপ্তানিতে প্রায় ৬ শতাংশ প্রণোদনা পান। বিপরীতে নতুন পলিয়েস্টার উৎপাদনকারীরা তুলনামূলক অনেক কম সহায়তা পান।
তিনি বলেন, 'আমরা যদি এসব নীতিসুবিধা না পাই, তাহলে বিশ্বের বড় উৎপাদনকারীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা খুব কঠিন।'
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য পরিষেবা প্রয়োজন। কারণ কন্টিনিউয়াস পলিমারাইজেশন প্রক্রিয়া সরবরাহে বিঘ্নের কারণে সহজেই ব্যাহত হয়।
সফল বলেন, 'একবার এসব প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে আবার চালু করে পণ্যকে প্রয়োজনীয় মানে ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে এবং এতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়।'
পানি ও দক্ষ জনবলের সংকট
মিরসরাইয়ের কারখানায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংকটে পড়তে হয়নি মডার্ন সিনটেক্সকে। তবে শিল্পকারখানার জন্য পানির সরবরাহ এখনো উদ্বেগের বিষয়।
কারখানাটি আংশিকভাবে ভূগর্ভস্থ পানি ও গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল। সফল বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের পরিকল্পিত পানি শোধনাগার হলে এ সমস্যা কিছুটা কমতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
মডার্ন সিনটেক্সে প্রায় ১ হাজার ১০০ মানুষ কাজ করেন। তাদের বড় একটি অংশ চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকার। তবে বিশেষায়িত কারিগরি জনবল পাওয়া এখনো একটি চ্যালেঞ্জ।
শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কারিগরি জনবল নিয়োগ করে এবং স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসে।
সফল বলেন, 'আমরা কর্মীদের কাজের মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। স্থানীয় কর্মীরা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করছেন এবং ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করছেন।'
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশে পলিয়েস্টারের উৎপাদন বাড়লে পোশাক রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা সহজ হবে।
তিনি বলেন, 'বিশ্বের পোশাকশিল্পে পলিয়েস্টারের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ যদি রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে এবং বেশি মূল্য সংযোজিত পণ্যের দিকে যেতে চায়, তাহলে কৃত্রিম তন্তুর স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, দেশে পলিয়েস্টারভিত্তিক পশ্চাৎমুখী সংযোগশিল্প শক্তিশালী হলে উৎপাদনে সময় কমবে, আমদানি ব্যয় কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বস্ত্র উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়বে।
