স্যুয়ারেজ সংযোগের অভাবে ৩,৪৮২ কোটি টাকার দাশেরকান্দি এসটিপির ৭৫% সক্ষমতাই অব্যবহৃত
বাসাবাড়ি ও ভবনে প্রয়োজনীয় স্যুয়ারেজ সংযোগ না থাকায় ৩ হাজার ৪৮২ কোটি টাকার দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার (এসটিপি) এখন সক্ষমতার মাত্র ২৫ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও আধুনিক এই স্থাপনাটি নিয়ে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
স্যুয়ারেজ সংযোগের মাধ্যমে কোনো ভবনের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা মূল স্যুয়ার লাইনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
রাজধানীর আফতাবনগরসংলগ্ন খিলগাঁওয়ে অবস্থিত প্ল্যান্টটি ৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকার পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন করতে পারে। তবে বর্তমানে এর আওতায় রয়েছে ২০ বর্গকিলোমিটারেরও কম এলাকা। ফলে প্ল্যান্টটির প্রায় ৭৫ শতাংশ সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন এভাবে কম সক্ষমতায় চললে একপর্যায়ে পরিশোধিত বর্জ্যপানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও সমস্যায় পড়তে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দাশেরকান্দি এসটিপি শতভাগ সক্ষমতায় চালু হলে শুষ্ক মৌসুমে পরিশোধিত পানি নিষ্কাশন নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, "শতভাগ সক্ষমতায় প্ল্যান্ট চালু হলে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত পানি ছাড়তে হবে। কিন্তু দখল ও দূষণের কারণে এলাকার খাল ও নদীর পানি ধারণ ও নিষ্কাশনক্ষমতা কমে গেছে। এতে শুষ্ক মৌসুমেও আশপাশের ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।"
আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, নাব্যতার সংকট বাড়তে থাকলে একসময় দাশেরকান্দি এসটিপির কার্যকারিতাই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
তার মতে, প্রয়োজনীয় স্যুয়ারেজ সংযোগ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই এত বড় বিনিয়োগ করা প্রকল্প পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতারই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, "এখনো সময় আছে দাশেরকান্দি ও নাসিরাবাদ এলাকার জলাধার ও খাল সংরক্ষণের। কয়েক বছর দেরি হলে দেখা যাবে, বিশাল প্ল্যান্ট আছে কিন্তু পরিশোধিত পানি বের করা যাচ্ছে না। তখন আবার হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নিতে হতে পারে।"
লক্ষ্য এলাকার মাত্র এক-চতুর্থাংশে সেবা
রাজধানীর পয়োবর্জ্য পরিশোধন করে বালু নদে ফেলার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৩ সালে দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার চালু হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় স্যুয়ারেজ সংযোগ না থাকায় এটি এখন প্রকল্প এলাকার মাত্র এক-চতুর্থাংশের বর্জ্য পরিশোধন করতে পারছে। ফলে প্ল্যান্টটির সক্ষমতার মাত্র ২৫ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইএমইডি।
রাজধানীর পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে ২০১৩ সালে একটি মহাপরিকল্পনা নেয় ঢাকা ওয়াসা। এর আওতায় ঢাকার আশপাশের নদ-নদীর দূষণ কমাতে পাঁচটি পয়ঃশোধনাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। এরই অংশ হিসেবে হাতিরঝিল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে আফতাবনগরের কাছে দাশেরকান্দিতে এ প্রকল্প নেওয়া হয়।
দাশেরকান্দি প্ল্যান্টের ৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকার পয়োবর্জ্য পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা ডিওএইচএস, বসুন্ধরা, বাড্ডা, ভাটারা, বনশ্রী, কুড়িল, সংসদ ভবন এলাকা, শুক্রাবাদ, ফার্মগেট, তেজগাঁও, আফতাবনগর, নিকেতন, সাঁতারকুল ও হাতিরঝিলের বর্জ্য পরিশোধনের লক্ষ্য নিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়। তবে বর্তমানে ২০ বর্গকিলোমিটারেরও কম এলাকার বর্জ্য পরিশোধন হচ্ছে এ প্ল্যান্টে।
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। এর বাইরে সরকার ব্যয় করেছে ১ হাজার ১০৬ কোটি টাকা এবং ঢাকা ওয়াসা ব্যয় করেছে ১০ কোটি টাকা।
পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০ বছর। ওয়াসা সূত্র জানায়, ঋণের সুদের হার ২ শতাংশ এবং ২০২৭ সাল থেকে এর কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে।
নাব্যতা হারাচ্ছে বালু নদ
সরেজমিন বালু নদ ও দাশেরকান্দি এসটিপি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষার পানিতে চারপাশ ভরে আছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময় নদীর এ অংশে পানি খুব কম থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার বলেন, "বর্ষা ছাড়া সারা বছরই এখানে পানি কম থাকে। আগে নদীটি আরও প্রশস্ত ছিল।"
২০২২ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের এক জরিপে বালু নদের তীরে ৩৯টি অবকাঠামো পাওয়া যায়। এর মধ্যে ছিল ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ১০টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পাঁচটি সরকারি স্থাপনা ও ১২টি সিঁড়ি।
বালু নদের নাব্যতা কমে যাওয়ার বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উৎস থেকে আসা আবর্জনায় নদটি ক্রমেই দূষিত হচ্ছে। একই সঙ্গে পলি ও বর্জ্য জমে বালু নদের সঙ্গে যুক্ত ৫১টি খালের বেশিরভাগের সংযোগও বন্ধ হয়ে গেছে।
মাঠপর্যায়ের সমীক্ষার ভিত্তিতে কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, বালু নদে ১০৪টি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো দিয়ে গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে পড়ছে এবং নাব্যতা কমাচ্ছে।
এদিকে দাশেরকান্দি ও নাসিরাবাদের নিচু এলাকার জলাশয়, কৃষিজমি ও জলাধার প্লট আকারে বিক্রি ও ভরাট হওয়ায় বালু নদের সঙ্গে যুক্ত অনেক খালও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাশেরকান্দি প্ল্যান্টের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখতে শুধু নদীর গভীরতা বজায় রাখাই যথেষ্ট নয়; সংযুক্ত খাল ও আশপাশের জলাধারও সংরক্ষণ করতে হবে।
সমন্বিত উদ্যোগের পরিকল্পনা
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) এ এইচ এম মো. ফরহাদ উজ জামান বলেন, দাশেরকান্দি এসটিপিকে কেন্দ্র করে বালু নদ ও আশপাশের এলাকায় আগে আলাদা কোনো ড্রেজিং উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই।
তবে বালু নদসহ ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর নাব্যতা ও প্রবাহ ঠিক রাখতে সরকার ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে এ কার্যক্রম শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
ফরহাদ উজ জামান বলেন, কোথাও তাৎক্ষণিকভাবে নাব্যতা বা পানিপ্রবাহের সংকট দেখা দিলে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও নেবে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম বলেন, অবৈধভাবে দখল করা খালের জায়গা পুনর্বাসনের সুযোগ নেই। সরকারি বা সংস্থার জমিতে কেউ অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করলে এর দায় তাকেই নিতে হবে।
তিনি বলেন, "খাল উদ্ধার ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি দুই পাড়ে হাঁটার পথ নির্মাণ করা হবে। এ কাজে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।"
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ঢাকার নদী, খাল ও জলাশয় সংস্কারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্য সচিব ও পরিবেশমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একাধিক বৈঠকও হয়েছে।"
তিনি জানান, "রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ উদ্যোগে যুক্ত থাকবে।"
দাশেরকান্দি এসটিপির পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহারে নতুন প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, "প্রকল্পটি এখনো প্রি-একনেক পর্যায়ে রয়েছে। এর আওতায় গুলশান, বনানী, বারিধারা, ট্রানজিট এলাকা ও পশ্চিম বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় স্যুয়ারেজ সংযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।"
তবে খাল ও জলাশয় রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০২০ সাল থেকে এগুলো আর ঢাকা ওয়াসার অধীনে নেই। দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তারা এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে।
