স্থানীয় নির্বাচন: প্রার্থী বাছাইয়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষার শঙ্কা বিএনপির তৃণমূলের
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে কেন্দ্রের নির্দেশনা উপেক্ষা করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।
চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। কেন্দ্র থেকে যোগ্য, সৎ, ত্যাগী ও সর্ব-মহলে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী করার নির্দেশনা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তা উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা ও সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে প্রার্থী করার চেষ্টা করবেন।
স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের বলয় ভারী করার পাশাপাশি প্রার্থী বাছাইয়ে অর্থের লেনদেনও হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও প্রভাবের বিষয়টি প্রাধান্য পেলে দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতারা বঞ্চিত হতে পারেন। কেন্দ্রের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি না থাকলে স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল আরও বাড়তে পারে। এতে নির্বাচনি মাঠে দলের সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজবাড়ীর একটি উপজেলার একজন চেয়ারম্যান পদপ্রত্যাশী বলেন, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন না দিয়ে সংসদ সদস্যরা নিজেদের রাজনৈতিক বলয় শক্তিশালী করতে পছন্দের ব্যক্তিকে দলীয় সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত টিবিএসকে বলেন, 'অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে হয়তো তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এমন একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অতীতে অনেক সময় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কেউ কেউ ব্যক্তিগত প্রভাব বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন। এবার সে সুযোগ নেই।'
তিনি বলেন, এবার প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশনা একটু ভিন্নভাবে দেওয়া আছে। নির্দেশনা না মানলে দল হার্ডলাইনে যাবে।
তিনি আরও বলেন, 'কেন্দ্র থেকে বিষয়টি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হবে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের তথ্য ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনও বিবেচনায় নেওয়া হবে।'
দিনক্ষণ ঠিক না হলেও ইতিমধ্যে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি। ধারাবাহিকভাবে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
২৯ আগস্ট বগুড়ার জেলা, থানা ও সিটি করপোরেশনের বিএনপি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে করেন তিনি। এর আগে ২০ আগস্ট পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন । ১৩ আগস্ট রাজশাহী বিভাগের অন্যান্য জেলা ও মহানগরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ২০ জুলাই রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তিনি।
এসব বৈঠকে নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে প্রতিটি এলাকায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান।
এর আগে চট্টগ্রামে এক সাংগঠনিক সভায় যোগ্য ও ত্যাগী নেতাকর্মীদেরই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্থানীয় সরকারে ১৩ সিটি করপোরেশন, ৩৩০ পৌরসভা, ৫০০ উপজেলা ও সাড়ে ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন রয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল দিতে চান বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন। ইউনিয়ন পরিষদের সিংহভাগেরই এ বছর মেয়াদ শেষ হচ্ছে উল্লেখ করে সিইসি বলেন, এসব নির্বাচন এ বছরের মধ্যে করতে হবে।
এদিকে স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় সমর্থন ও আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ বিরোধ, কোথাও কোথাও তা গড়াচ্ছে সংঘর্ষে।
এরইমধ্যে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১০৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৯৩৩ জন আহত হয়েছেন। এসময় নিহত হয়েছেন ২০ জন।
একাধিক প্রার্থী
এরইমধ্যে স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় একই পদে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। কোথাও কোথাও ১০-১২ জন পর্যন্ত প্রার্থী প্রচারণা চালাচ্ছেন। দলীয় সমর্থন পেতে তারা তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা বেশি থাকলেও প্রার্থী বাছাইয়ে কোনো অসুবিধা হবে না বলে জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সরব আছেন অন্তত পাঁচজন নেতা। কুমিল্লার দেবিদ্বার পৌরসভায় মেয়র পদেও বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন; অথচ এই পৌরসভায় জামায়াতের একক প্রার্থী সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম শহীদ।
স্থানীয় নির্বাচনের লড়াইয়ে নামার আগে এই ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা সামাল দিতে ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং সুশৃঙ্খলভাবে প্রার্থী বাছাই করাই এখন বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
