সব বয়সী শিশুদের মধ্যে ছড়াচ্ছে হাম, মৃত্যু প্রায় ১,০০০
প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও দেশে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মোট মৃত্যু প্রায় ১,০০০-এ পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারের অগ্রাধিকারে নেই। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাদের মতে, সংক্রমণ এখন প্রায় সব বয়সী শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই প্রমাণভিত্তিকভাবে টিকাদানের বয়সসীমা অন্তত ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো, মাঠপর্যায়ে মাইক্রোপ্ল্যানিং জোরদার এবং কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি ছাড়া এ প্রাদুর্ভাব থামানো সম্ভব হবে না।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের বয়সসীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংশ্লিষ্ট মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯৪।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম সন্দেহে মোট ১ লাখ ৪৪ হাজার ১৬৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭২ জন।
'সব বয়সী শিশুর মধ্যে সংক্রমণ, এভাবে চললে সংক্রমণ কমবে না'
জাতীয় হাম ও রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কারণ সংক্রমণ এখন প্রায় সব বয়সী শিশুর মধ্যেই রয়েছে।
তিনি বলেন, "ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর—সব বয়সী শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ রয়েছে। কোথাও কোথাও সামান্য কমলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। এতে বোঝা যায়, ঘোষিত টিকাদান কভারেজ বাস্তবে কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়নি।"
তিনি বলেন, "১০৩ শতাংশ কভারেজের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। লক্ষ্য নির্ধারণেই অসঙ্গতি থাকলে কভারেজের হিসাবও বিভ্রান্তিকর হতে পারে।"
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, এখন প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ। কোন এলাকায় এবং কোন বয়সী শিশু বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে সেখানে অতিরিক্ত টিকাদান চালাতে হবে।
তিনি বলেন, "আমার মতে শুধু পাঁচ বছর নয়, অন্তত ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনা উচিত।"
তিনি আরও বলেন, শুধু টিকা সরবরাহ করলেই হবে না। মায়েদের শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের জ্বর হলে দ্রুত শনাক্ত ও আলাদা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
তার অভিযোগ, হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, "অতীতে ক্যাম্পেইনের পর সংক্রমণ দ্রুত কমে যেত। এবার তা হচ্ছে না। আলোচনা নেই, বিশেষ ব্যবস্থা নেই—শুধু সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।"
'কমিউনিটি ছাড়া আইসিইউ দিয়ে মহামারি ঠেকানো যাবে না'
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণের কৌশল হাসপাতাল বা আইসিইউকেন্দ্রিক না হয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে হতে হবে। কমিউনিটির সম্পৃক্ততা ছাড়া রোগী শনাক্ত, প্রতিরোধ ও আইসোলেশন কার্যকরভাবে করা সম্ভব নয়। রোগী আইসিইউতে পৌঁছানোর পর মৃত্যু কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
তিনি বলেন, "জরুরি পরিস্থিতিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া ঠিক হলেও দীর্ঘমেয়াদে ইপিআইয়ের প্রচলিত মাইক্রোপ্ল্যানিং পদ্ধতিতে ফিরতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি শিশুর তালিকা তৈরি করতে হবে, কে টিকা পাবে তা নির্ধারণ করতে হবে এবং তাদের বাড়ির কাছের টিকাকেন্দ্রের তথ্য আগে থেকেই জানিয়ে দিতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "ছিটেফোঁটা টিকা দিয়ে কখনোই ৯৫ শতাংশ কভারেজ হবে না। আধুনিক জনস্বাস্থ্যে 'যা হয় হবে' ধরনের কৌশলের কোনো জায়গা নেই।"
ডা. মুশতাকের মতে, পাঁচ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনতে হবে। কারণ এ বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে।
'অবহেলা চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে'
ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করে বলেন, হামকে গুরুত্ব না দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হামের প্রাদুর্ভাব থাকলেও বাংলাদেশের মতো উচ্চ মৃত্যুহার দেখা যাচ্ছে না। এটি রোগী ব্যবস্থাপনা ও প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।
বয়সসীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত হয়নি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, টিকাদানের বয়সসীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "প্রাদুর্ভাব শুরুর মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে আমরা দ্রুত ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় এনেছি। যদিও পরে দেখা গেছে, এ বয়সী প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার বাইরে ছিল।"
তিনি বলেন, পরে বাদ পড়া এসব শিশুকে টিকার আওতায় আনতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া হয়েছে। জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ) সুপারিশ করলে পাঁচ থেকে ১০ বা ১৫ বছর বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা হবে।
চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর সরকার ৫ এপ্রিল জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে।
প্রথম দফার কর্মসূচির নির্ধারিত শেষ দিন ২০ মে পর্যন্ত ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়, যা ১ কোটি ৮০ লাখের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচির পর জুন ও জুলাইয়ে হামে আক্রান্ত, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কমার হার প্রত্যাশিত মাত্রায় ছিল না। কারণ টিকাদানের প্রকৃত কভারেজে ঘাটতি ছিল, যা ২৮ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় ভিটামিন 'এ' প্লাস ক্যাম্পেইনের পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ওই ক্যাম্পেইনে একই বয়সসীমার ২ কোটি ২৩ লাখ শিশু ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল পায়। তখন দেখা যায়, ওই বয়সী প্রায় ৩৯ লাখ শিশু হামের টিকার বাইরে রয়ে গেছে।
পরে সরকার স্বীকার করে, হাম টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা কম নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে জুলাইয়ের শেষ দিকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকা দিতে একটি মপ-আপ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়। রোববার পর্যন্ত এ কর্মসূচির আওতায় মোট প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ ২১ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
তবুও এ উদ্যোগ যথেষ্ট কার্যকর হয়নি। কারণ জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে হামে আক্রান্ত, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যু—তিনটি সূচকই আবার বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৯৩৪ জনে, যা জুলাইয়ে ছিল ৩১ হাজার ৩২৭ জন। একই সময়ে দৈনিক গড় আক্রান্তের সংখ্যা ১,০১০ থেকে বেড়ে ১,০৬২ জনে দাঁড়িয়েছে।
আগস্টে মোট ২৭ হাজার ৪৫৮ জন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যেখানে জুলাইয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ২৬ হাজার ৩৬০ জন। দৈনিক গড় ভর্তি রোগীর সংখ্যাও ৮৫০ থেকে বেড়ে ৮৮৬ জন হয়েছে।
একইভাবে মৃত্যুও বেড়েছে। আগস্টে হামে ১৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা জুলাইয়ের ১১৯ জনের তুলনায় ১৭ জন বেশি।
