বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে; মৃত্যু ১,০০০ ছাড়াল
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে।
প্রাদুর্ভাব শুরুর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও দেশে হাম পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এ সময়ে রোগটিতে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মিলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২ জনে। এর মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু সরাসরি হামেই হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সিডিসির তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হামের সংক্রমণ ঘটেছে বাংলাদেশে। এ সময়ে দেশে ৫৭ হাজার ৫৬১ জন আক্রান্ত হয়েছে।
বিশ্বের হামের প্রাদুর্ভাবের তালিকায় বাংলাদেশের পরই রয়েছে ভারত। দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছে ২৬ হাজার ৩৩২ জন। তালিকার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ইয়েমেন (১৪ হাজার ৯৬১), মেক্সিকো (১২ হাজার ২৫২), পাকিস্তান (১১ হাজার ২১২), ক্যামেরুন (৯ হাজার ৩৯৪), গুয়াতেমালা (৭ হাজার ৬৭), কাজাখস্তান (৬ হাজার ৯৬৮), অ্যাঙ্গোলা (৬ হাজার ৭৩৭) এবং মাদাগাস্কার (৫ হাজার ৬৬৪ জন)।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে গতকাল পর্যন্ত সন্দেহভাজন হামের রোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি—১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০ জন। তাদের মধ্যে পরীক্ষাগারে ১৯ হাজার ৯০৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান থেকে বাদ পড়া এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টিকা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় শিশুরা হামের বড় ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে; যাদের নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা দেওয়ার বয়স এখনো হয়নি। আর এ পরিস্থিতি বিভিন্ন বয়সী মানুষের মাঝেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে।
সোমবার সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হোসাইন জানিয়েছেন, টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান বাতিল করায় আরও অনেক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
হামের প্রাদুর্ভাবটি এমন এক সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যখন রোগটি নির্মূলের পথে বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছিল। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকের অধিকাংশ সময়েই বাংলাদেশে হামের টিকাদানের হার বেশি ছিল। এ সময় অধিকাংশ বছরেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি টিকাদানের হার বজায় ছিল। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে এই হার কমে যায়।
মহামারি বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, '২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ হামের সংক্রমণ নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।'
তিনি বলেন, 'আমার জানা মতে, বাংলাদেশে আগে কখনো হামে এত শিশুর মৃত্যু হয়নি। এক বছরে এত বেশি রোগীও আমরা আগে দেখিনি। এটি সত্যিই ভয়াবহ পরিস্থিতি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এর শিকার হচ্ছে শিশুরা।'
মাহমুদুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিকভাবে টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, টিকাদানের আওতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা জোরদার করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
'সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত—সব মৃত্যুই হামের মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা উচিত'
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হামের রোগীদের মধ্যে যেসব মৃত্যু হয়েছে, সেগুলো সবই হামের কারণে মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
তাদের মতে, হামকে মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে বিবেচনায় না নিয়ে পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হওয়া রোগী ছাড়া অন্য মৃত্যুর কারণ হিসেবে নিউমোনিয়া বা অন্য কোনো রোগকে দায়ী করার কোনো ভিত্তি নেই।
হাম ও রুবেলা নির্মূলবিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান টিবিএসকে জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী হামের রোগীকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: সন্দেহভাজন, সম্ভাব্য ও নিশ্চিত।
তিনি বলেন, 'নিশ্চিত ও সম্ভাব্য রোগীর মধ্যে বড় পার্থক্য হলো, একজনের ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে, অন্যজনের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। তবে দুজনকেই হামের রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো প্রাদুর্ভাবের সময় একটি গুচ্ছে কয়েক রোগীর হাম নিশ্চিত হলে, একই ধরনের উপসর্গ থাকা এবং ওই রোগীদের সঙ্গে মহামারিবিদ্যাগতভাবে সম্পৃক্ত অন্য রোগীদেরও হামের রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।'
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে হাম নতুন কোনো রোগ নয়। বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসকেরা ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি, জ্বরসহ অন্যান্য শারীরিক উপসর্গ দেখে রোগটি শনাক্ত করে আসছেন।
তিনি বলেন, 'প্রাদুর্ভাবের সময় প্রতিটি রোগীর পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই।'
মাহমুদুর রহমান উল্লেখ করেন, হামে আক্রান্ত হয়ে বেশির ভাগ মৃত্যু সরাসরি এই ভাইরাসের কারণে হয় না; বরং এর থেকে তৈরি হওয়া বিভিন্ন জটিলতার কারণে ঘটে। এর মধ্যে নিউমোনিয়া অন্যতম।
তিনি বলেন, 'হামের পর হওয়া নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া হামেরই জটিলতা। হামের কারণে হওয়া নিউমোনিয়া যদি মৃত্যুর মূল কারণ হয়, তাহলে সেটিকে হামে মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।'
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসাইন টিবিএসকে বলেন, প্রাদুর্ভাব চলাকালে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া রোগীদের হামের রোগী হিসেবেই চিকিৎসা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, 'সরকার এখন ব্যাপকভাবে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করছে না, আমরাও মনে করি এর প্রয়োজন নেই। সহজলভ্য দ্রুত রোগ নির্ণয়ের কোনো পরীক্ষা নেই। এমনকি হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হলেও চিকিৎসার ধরন বদলায় না। সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত—দুই ধরনের রোগীর চিকিৎসাই একই।'
কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শিশুদের মৃত্যু চলতেই থাকবে
ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, আগে কোনো প্রাদুর্ভাবের সময় টিকাদান কর্মসূচি চালানোর পর হামের সংক্রমণ দ্রুত কমে আসত। কিন্তু এবার তা হয়নি।
তিনি বলেন, 'এবার প্রায় সব বয়সী শিশু ও কিশোরের মধ্যেই হামের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। নতুন ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে প্রতিদিন শিশু মৃত্যুর এই ধারা চলতে পারে।'
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পাঁচ থেকে ১৫ বছর বয়সী বাদ পড়া শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং আক্রান্ত রোগীদের কার্যকরভাবে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা জরুরি বলে জানান তিনি।
ডা. মুশতাক বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় হাসপাতাল বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের বদলে পুরো জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই বয়সী শিশুদের মধ্যেও হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় পাঁচ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের দ্রুত টিকা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন তিনি।
