যেভাবে শত একর জমি হারিয়েছে চন্দনাইশের খেয়াংরা
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গহিন জনপদে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী খেয়াং সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকটি পাড়া রয়েছে। সেখানে শতাধিক খেয়াং পরিবার দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করে আসছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চন্দনাইশ উপজেলাটি বান্দরবান জেলা সীমান্তঘেঁষা হলেও, সেখানকার খেয়াংদের সঙ্গে এই জনগোষ্ঠীর সামাজিক যোগাযোগ বেশ সীমিত। আত্মীয়তা বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সামান্য যোগাযোগ থাকলেও তা তেমন গভীর নয়।
চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা হিসেবে তারা সমতলের প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। তবে নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা পাহাড়ের মতো এখানেও নিজেদের চিরাচরিত 'কারবারী' (পাড়াপ্রধান) প্রথা টিকিয়ে রেখেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, পাড়ার অভ্যন্তরীণ বিচার-সালিশ বা যেকোনো সামাজিক সমস্যা সমাধানে কারবারীই প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
সম্প্রতি চন্দনাইশের এই খেয়াং জনপদ সরেজমিনে পরিদর্শনে যাওয়া হয়। বান্দরবান সদর উপজেলার গুংগুরু খেয়াং পাড়া পার হওয়ার পর চন্দনাইশ অংশে শুরু হয় কর্দমাক্ত পথ। সেই পিচ্ছিল পথ ধরে আধা ঘণ্টা এগোলে চোখে পড়ে এক বিস্তীর্ণ বিল, যা স্থানীয়ভাবে 'খেয়াং বিল' নামে পরিচিত। এই বিলের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়ন সড়ক।
পাকা সড়কটি এখন নামমাত্র টিকে আছে। ইট উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে পুরো তিন-চার কিলোমিটার জুড়ে। জরাজীর্ণ এই পথে চলাচলে পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। সড়কের শেষ প্রান্তে মংলারমুখ খেয়াং পাড়া। সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক যেন এক বিলাসিতা; মাঝেমধ্যে রবি বা গ্রামীণফোনের সিগন্যাল পাওয়া গেলেও তা ক্ষণস্থায়ী।
পাঁচ প্রজন্মের ৪০০ বছরের বসতি
মংলারমুখ পাড়ার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চন্দনাইশের ধোপাছড়ি ইউনিয়নে বর্তমানে ১২২টি খেয়াং পরিবার বসবাস করছে। এর মধ্যে ২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর ও দক্ষিণ কালেক্টরি পাড়ায় (পশ্চিম গুংগুরু) ৬৬টি, শনবনিয়া পাড়ায় ১৪টি এবং কউ ছড়া পাড়ায় ৯টি পরিবার রয়েছে। এছাড়া ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মংলারমুখ পাড়ায় ৮টি, কড়াবিল পাড়ায় ৯টি, ঘোনা পাড়ায় ৮টি এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বড়ঘোনা পাড়ায় ৮টি পরিবার বাস করছে।
মংলারমুখ পাড়ার কারবারীর দায়িত্বে আছেন ৪৩ বছর বয়সী চাইগ্য খেয়াং। পেশায় কৃষক চাইগ্যর নিজস্ব বন্দোবস্তকৃত দুই কানি ধানি জমি রয়েছে। সেখানে তিনি শিম, বরবটি ও বেগুনের চাষ করেন। পাশাপাশি জুম চাষ এবং ৩ হাজার ২০০টি কলাগাছের একটি বিশাল বাগানও রয়েছে তার।
এই এলাকায় তাদের বসবাসের ইতিহাস শত বছরের পুরনো। চাইগ্য খেয়াং বলেন, 'আমরা এখানে পাঁচ প্রজন্ম ধরে বসবাস করছি। আমার বাবা খেসাই খেয়াং-এর বয়স এখন ১০২ বছর। তার আগে আরও তিন পুরুষ এখানে ছিলেন। সেই হিসাবে আমাদের বসতি ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে।'
বংশপরম্পরার হিসাব টেনে তিনি আরও বলেন, 'আমার দাদা মংসাই খেয়াং বৃদ্ধ বয়সে মারা গেছেন। তার বাবার নাম ছিল অং মহাজন এবং অং মহাজনের বাবা ছিলেন ফং মহাজন। চার পুরুষের গড় আয়ু ৮০ বছর ধরলে ৩২০ বছর হয়। আমার বড় ভাইয়ের বয়স এখন ৬৫ বছর। সব মিলিয়ে ৪০০ বছরের কাছাকাছি সময় আমরা এখানে আছি।'
শতবর্ষী বাবার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে চাইগ্য বলেন, 'অতিরিক্ত বয়সের কারণে তিনি এখন অনেক কিছুই মনে রাখতে পারেন না। সন্তানদেরও চিনতে পারেন না। অসংলগ্ন কথাবার্তা বললেও তার কথা বেশ স্পষ্ট এবং কণ্ঠস্বর এখনো সাবলীল।'
এক পরিবারই হারিয়েছে ২০০ কানি ধানি জমি
ধোপাছড়ি ইউনিয়নের দুই পাশেই গভীর বন। একসময় এটি 'ধোপাছড়ি রিজার্ভ ফরেস্ট' নামে পরিচিত ছিল। ২০১০ সালে সরকার একে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করার পর নাম হয় 'দুধপুকুরিয়া-ধোপাছড়ি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য'।
এই বনাঞ্চলের মাঝে একসময় বিশাল সমতল ধানি জমি ছিল খেয়াংদের অধীনে। পাড়াবাসীদের দাবি, জঙ্গল পরিষ্কার করে তাদের পূর্বপুরুষরাই এই জমিগুলোকে আবাদযোগ্য করে তুলেছিলেন। কিন্তু সময়ের আবর্তে তারা সেই জমির মালিকানা হারিয়েছেন।
মংলারমুখ পাড়ার চাইগ্য খেয়াং ও চিংগ্য খেয়াং জানান, 'খেয়াং বিলের প্রায় ২০০ কানি (১ কানি = ৪০ শতক) জমি একসময় আমাদের পূর্বপুরুষদের ভোগদখলে ছিল। তখন শিক্ষার অভাব ও অসচেতনতার কারণে তারা জমির বন্দোবস্ত বা সঠিক দলিল করেননি। সেই সুযোগে জমিগুলো এখন অন্যের হাতে চলে গেছে। তবে এলাকাটি এখনো 'খেয়াং বিল' নামেই পরিচিত।'
জমি হারানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে তারা বলেন, 'টাকার প্রয়োজনে দাদারা কখনো সামান্য জমি বিক্রি করেছেন বা বন্ধক দিয়েছেন। অক্ষরজ্ঞান না থাকার সুযোগে ক্রেতারা দলিলে ৫ কানির জায়গায় ১০ কানি লিখে নিয়েছে। এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে অনেক জমি বেহাত হয়েছে।'
তারা আরও জানান, 'আমাদের জ্যাঠা ক্যউ খেয়াং ছিলেন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার। তার একারই ১০০ কানির বেশি জমি ছিল। তিনি ঢাকা-চট্টগ্রামে আদা-হলুদ ব্যবসা করতেন। ব্যবসায় লোকসান হলে কিছু জমি বন্ধক রাখতেন। কিন্তু কৌশলে সেই জমির পরিমাণ কাগজে বাড়িয়ে লিখে নিতেন মহাজনরা। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে টাকা শোধ করেও তিনি আর জমি ফেরত পাননি। এখন তার পরিবারের সম্বল বলতে শুধু ভিটেটুকু আর কিছু খাস জমি।'
খেয়াং বিলের পাশের শান্তিরহাট বাজারের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মো. রাজ্জাক বলেন, 'আমরাও শুনেছি এটি একসময় খেয়াংদের বিল ছিল। তবে গাছবাড়িয়া এলাকার কিছু লোক দলিলপত্র করে এখানকার মালিকানা নিয়ে নেয়। পরে তারা আবার অন্যদের কাছে বিক্রি করে চলে গেছে। এখন যারা মালিক তারা সবাই কেনাসূত্রে ভোগদখল করছেন। খেয়াংরা ঠিক কোথায় চলে গেছে তা আমরা জানি না।'
আবারও জুমচাষে ফেরা
সমতলের শত শত একর ধানি জমি হারিয়ে খেয়াংরা এখন আবারও প্রথাগত জুমচাষে ফিরতে বাধ্য হয়েছে। মংলারমুখ পাড়ার বাসিন্দা অংসাউ ও থুইগ্য খেয়াং জানান, তাদের পূর্বপুরুষদের অনেক জমি থাকলেও বর্তমানে তাদের নামে মাত্র ২-৩ কানি জমি অবশিষ্ট আছে। সেখানে ধান ও সবজি চাষের পাশাপাশি তারা পাহাড়ের জুমচাষের ওপর নির্ভর করেন। জুমের ধান খুব বেশি না হলেও বছরের খোরাকি অন্তত চলে।
তারা আক্ষেপ করে বলেন, 'আগে এই এলাকায় ৫০-৬০টি খেয়াং পরিবার ছিল। ভূমিহীন হয়ে এবং ঋণের দায়ে অনেকে পাশের গুংগুরু পাড়ায় বা অন্য কোথাও চলে গেছে।'
ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের খেয়াং পাড়াগুলো বেশ বিচ্ছিন্ন। আশেপাশে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। অসুস্থ হলে কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বাজারে গিয়ে ওষুধ আনতে হয়। পাড়ার পাশেই বান্দরবানের একটি খেয়াং নারী সংগঠন পরিচালিত বেসরকারি স্কুলে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৭৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
তিন পাড়ার এক বৌদ্ধ বিহার
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এই সম্প্রদায়ের জন্য তিনটি পাড়া মিলে একটি বিহার রয়েছে। বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি এই 'মংলারমুখ জগৎ পূজ্য বৌদ্ধ বিহার' মংলারমুখ পাড়ার একটি টিলার ওপর অবস্থিত।
বিহারের বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত নন্দ বংশ স্থবির এখানে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আছেন। তিনি জানান, বিহারে বিহারাধ্যক্ষ নেই শুনে তিনি এখানে এসেছিলেন এবং এরপর থেকে নিয়মিত ধর্মীয় সভা ও ধর্মদেশনার (বৌদ্ধ ধর্মে বুদ্ধ বা ভিক্ষুসংঘের দেওয়া পবিত্র ধর্মীয় আলোচনা ও উপদেশ) মাধ্যমে পাড়াবাসীদের ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছেন।
খেয়াংদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়
খেয়াং জনগোষ্ঠীর আদি নাম 'হ্যাওচ'। 'হ্যাও' মানে খুব কাছের এবং 'চ' মানে শিশু। অর্থাৎ ভাষাগত অর্থে 'হ্যাওচ' মানে 'খুব কাছের শিশু'। খেয়াং ভাষার বর্ণমালা উদ্ভাবক ও সংস্কৃতিকর্মী ক্যসামং খেয়াং জানান, এই নামকরণের পেছনে দুটি প্রচলিত মতবাদ রয়েছে।
প্রথম মতানুসারে, প্রাচীনকালে 'লাংগ্যে' নামক এক দস্যু জনগোষ্ঠীর হাত থেকে বাঁচতে নিরীহ খেয়াংরা নিজেদের শিশুদের মতো অসহায় মনে করত। সেখান থেকেই 'হ্যাওচ' নামটি এসেছে।
দ্বিতীয় মতানুসারে, প্রতিবেশী মারমাদের সঙ্গে জুমচাষের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে তান্ত্রিক বিদ্যার কিছু ঘটনার কারণে মারমারা তাদের 'ঝাল আদা' বলে ডাকত। এই নামটিই পরে তাদের জাতিগত পরিচয়ে জড়িয়ে যায়।
জনসংখ্যার দিক থেকে নবম
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বান্দরবান জেলায় খেয়াংদের সংখ্যা ২ হাজার ৫০২ জন। জেলার ১১টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে জনসংখ্যার ভিত্তিতে তারা নবম। তবে খেয়াং নেতাদের মতে, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রাম মিলে তাদের মোট জনসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। তাদের মধ্যে মূলত দুটি ভাগ রয়েছে: লাইতু (সমতলে বসবাসকারী) ও কুনতু (পাহাড়ে বসবাসকারী)। লাইতুরা সাধারণত বৌদ্ধ এবং কুনতুরা খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী।
ত্রিপুরা সম্প্রদায়: অশান্ত পাহাড় থেকে লোকালয়ে
মংলারমুখ থেকে এক ঘণ্টার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে বিক্রমপুর ত্রিপুরা পাড়া। ১৯৮৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্ত পরিস্থিতির কারণে বিলাইছড়ির রাইক্ষ্যং এলাকা থেকে প্রায় ১০০ পরিবার এখানে এসে বসতি গড়েছিল। বর্তমানে এখানে ৭০টি পরিবার রয়েছে।
পাড়ার দোকানদার সুজন ত্রিপুরা জানান, হেডম্যান বিক্রম মনি ত্রিপুরার নেতৃত্বে তারা এখানে এসেছিলেন। কথা ছিল রাস্তাঘাট ও স্বাস্থ্যসেবা হবে, কিন্তু ১৯৯৬-৯৮ সালের দিকে হাতির আক্রমণে বিক্রম মনির মৃত্যুর পর সব থমকে যায়। ২০১৭ সালে একবার ইউএনও আসলেও এরপর বড় কোনো উন্নয়ন হয়নি। পাড়াটির একমাত্র শিক্ষার্থী চন্দ্রমোহন ত্রিপুরা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, যা তাদের জন্য এক বড় অর্জন।
সেখানে স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা আরও শোচনীয়। ২০১৬-১৭ সালের পর কোনো টিকাদান কর্মী পাড়ায় আসেননি। তিন ঘণ্টা হেঁটে শিশুদের টিকা দিতে নিয়ে যেতে হয় ধোপাছড়ি বাজারে।
আবাসিক স্কুলের আশ্বাস
ধোপাছড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জয়নাল আবেদিন জানান, ভৌগোলিক কারণে এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় উন্নয়ন বরাদ্দ সামান্য হলেও তিনি সবাইকে সমানভাবে সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। সংরক্ষিত মহিলা সদস্য লতিফা আক্তার জানান, খেয়াং ও ত্রিপুরাদের জন্য ধোপাছড়ি বাজার এলাকায় একটি আবাসিক স্কুল তৈরির পরিকল্পনা চলছে, যাতে গহিন বনের শিশুদের যাতায়াতের কষ্ট লাঘব হয়।
চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুর রহমান বলেন, 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষা সহায়তার বরাদ্দ প্রতিবছরই দেওয়া হয়। তবে পার্বত্য সীমান্ত এলাকা হওয়ায় কিছু নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজির সমস্যা রয়েছে, যা উন্নয়ন কাজে বাধা সৃষ্টি করে। বর্তমানে এলজিইডি ও সড়ক বিভাগের অধীনে ওই এলাকায় সড়ক উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে।'