ডেঙ্গু আক্রান্ত দ্রুত বাড়ছে, পরিস্থিতি আরও খারাপের আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। টানা চারদিন ধরে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মেডিকেল এনটোমোলজিস্ট অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, শুধু সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "আমাদের নজরদারি ও পূর্বাভাস মডেল স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এক মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।"
তিনি বলেন, থেমে থেমে বৃষ্টি, ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার জন্য অনুকূল তাপমাত্রা এবং নজরদারির তথ্য—সবকিছুই সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে পরিস্থিতির আরও অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এডিস মশা এখন জেলা, উপজেলা এমনকি অনেক গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
হাসপাতালে দৈনিক ভর্তি বেড়ে ১,৩২৪
গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৩২৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
নতুন মৃত্যুসহ চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০৭ জনে দাঁড়িয়েছে। আর মোট আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে ৩৮ হাজার ২৮০।
টানা চার দিন ধরে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত ৩০ আগস্ট ১ হাজার ৯৭ জন, ৩১ আগস্ট ১ হাজার ১৬৩ জন এবং ১ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৩২৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা জুলাইয়ের ৯ হাজার ২০৬ জনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এখন দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ঢাকা ও বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে।
হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "গত এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ অনেক বেশি। বর্তমানে আমাদের হাসপাতালে ২৫০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৩৭ জন।"
তিনি বলেন, "আমাদের দুটি পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ১৪০টি শয্যা রয়েছে। এর পাশাপাশি মেডিসিন ওয়ার্ডেও অতিরিক্ত রোগী রাখা হচ্ছে। শয্যার বাইরে মেঝেতেও রোগী রয়েছেন।"
ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, রোগীর চাপ বাড়ায় হাসপাতালে নার্স ও ওয়ার্ডবয়ের কিছু ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া শিশুদের জন্য ব্যবহৃত স্যালাইনের সরবরাহেও সংকট দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, "বেবি স্যালাইনের সংকট আছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।"
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৫০ শয্যার পৃথক ওয়ার্ড চালু করা হলেও সেখানে প্রতিদিন ৭০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন।
ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালে নতুন ৫০ শয্যার একটি ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নুরুল ইসলাম। এছাড়া নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ২৫০টি শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, "হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। তবে দেশে এখনো বড় ধরনের শয্যা সংকট তৈরি হয়নি। যেসব হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে, সেখানে অতিরিক্ত ওয়ার্ড চালু করা হচ্ছে।"
তিনি বলেন, "অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি।"
তিনি আরও জানান, কোথাও সাময়িকভাবে স্যালাইনের ঘাটতি তৈরি হলে স্থানীয়ভাবে তা সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে স্থানীয় সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ।
ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করতে হবে। দেরিতে হাসপাতালে যাওয়ার কারণে মৃত্যু বাড়ছে।
'ফগিং নয়, প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা'
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মূল সমস্যা হলো প্রমাণভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন না করা।
তিনি বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপ্তাহিক জরিপে কোথায় কত শতাংশ এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। কিন্তু সেই হটস্পটগুলো লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে রাস্তায় ফগিং ও সাধারণ লার্ভিসাইডিংয়ের মতো গতানুগতিক কার্যক্রমই চলছে।
তিনি বলেন, "যেখানে এডিস মশা জন্মাচ্ছে, সেখানে যদি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমই না পৌঁছায়, তাহলে শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।"
কবিরুল বাশার বলেন, ঢাকার বাইরে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলোরও মশা নিয়ন্ত্রণে নির্ধারিত দায়িত্ব ও বাজেট রয়েছে। তাই দ্রুত মশা নিধনে প্রমাণভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিতে হবে।
