ঋণ পেতে জটিলতায় বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল; আটকে আছে ১,৭৬৫ কোটি টাকার অর্থায়ন
মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রাথমিকভাবে ৪,১৪৬ কোটি টাকার একটি ইস্পাত প্রকল্প অর্থায়ন-সংক্রান্ত বিরোধে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অনুমোদিত ঋণের ১,৭৬৫ কোটি টাকা এখনো ছাড় হয়নি, আর এরইমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ২৭৫ কনটেইনার যন্ত্রপাতি চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে আছে।
২০২১ সালে বার্ষিক ১২ লাখ ৫০ হাজার টন উৎপাদনক্ষমতার এই কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। শুরুতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কারখানাটিতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরুর কথা থাকলেও এখনও কার্যক্রম শুরু হয়নি।
কোম্পানির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আটটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমোদিত ২,৩০৫ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড ঋণের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫৪০ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে।
বাকি ১,৭৬৫ কোটি টাকা এখনও ছাড় না হওয়ায় নির্মাণকাজ শেষ করা, আমদানি করা মূলধনী যন্ত্রপাতি খালাস এবং প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সূচি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তারা।
কোম্পানির হিসাবে, এ বিলম্বের কারণে ২০২১ সালের তুলনায় প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৭২ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থায়ন নিয়ে বিরোধ
অর্থায়ন নিয়ে জটিলতার মূল বিষয় হলো, প্রকল্পটির উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হবে কি না—এ প্রশ্ন।
কোম্পানির দাবি, সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল একটি স্বতন্ত্র ব্যবসায়িক গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক হিসাব ও ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রেকর্ডও আলাদা।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একই পরিচালক থাকা একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো একটি ঋণখেলাপি হলে সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে।
সিন্ডিকেটেড ঋণের লিড ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর ঋণের অর্থ ছাড় বন্ধ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি ঋণখেলাপি হলে একই মালিকের অন্য কোম্পানিও ঋণ পাবে না।"
তবে রপ্তানিমুখী ব্যবসা বা বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি জানান। বসুন্ধরার প্রকল্পটি বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন কোনো নির্দেশনা দিলে ঋণের অর্থ ছাড় করা হবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো কোম্পানির ঋণ খেলাপি হলে একই পরিচালকদের মালিকানাধীন অন্য কোম্পানিও ঋণ নিতে পারবে না।
তিনি বলেন, প্রকল্পটিতে করা বিনিয়োগের বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও উদ্বিগ্ন। প্রচলিত আইনি কাঠামোর আওতায় বিষয়টি বিবেচনার জন্য কোম্পানিটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে পারে।
বন্দরে আটকে আছে প্রকল্পের যন্ত্রপাতি
কোম্পানির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতিবাহী প্রায় ২৭৫টি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে আছে।
এসব যন্ত্রপাতির মূল্য প্রায় ৫৩৪ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকায় জমতে থাকা বন্দর চার্জসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ হয়ে মোট খরচ প্রায় ৯৫০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
কোম্পানির দাবি, প্রায় দুই বছর ধরে এসব যন্ত্রপাতি খালাস করা সম্ভব হয়নি। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা আরও প্রায় ১৮ মাস পিছিয়ে যেতে পারে বলে তাদের ধারণা।
প্রকল্পের মেয়াদ ১৮ মাস বাড়ানোর আবেদন করেছিল কোম্পানিটি। তবে অনুমোদনের অপেক্ষায় ইতোমধ্যে ১২ মাস পেরিয়ে গেছে। ফলে প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য হাতে খুব কম সময় রয়েছে।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, সিন্ডিকেটেড ঋণে অংশ নেওয়া আট ব্যাংকের মধ্যে চারটি ব্যাংক এখনও অর্থায়নের মেয়াদ বাড়ায়নি।
বন্দরে যন্ত্রপাতি আটকে থাকায় ডেমারেজসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয়ও বাড়ছে।
সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) সাহেদ জাহিদ বলেন, অর্থায়ন সংকটে নির্মাণকাজের গতি কমে যাওয়ার আগেই প্রকল্পটিতে ১,০০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে কোম্পানি।
তিনি বলেন, "অতিরিক্ত বিলম্ব প্রকল্পের ব্যয় বাড়াচ্ছে, আর্থিকভাবে প্রকল্পের সক্ষমতা দুর্বল করছে এবং বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতা—উভয়ের ওপরই চাপ বাড়াচ্ছে।"
জাহিদ বলেন, সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল যে একটি পৃথক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং এর সিআইবি রেকর্ডও আলাদা—তা প্রমাণে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, "আমরা সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান। আমাদের হালনাগাদ সিআইবি রিপোর্ট রয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের আলাদাভাবে বিবেচনা করেনি, যার প্রভাব পড়েছে বড় অঙ্কের এই বিনিয়োগে।"
কোম্পানির দাবি, বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ বা সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল—কোনোটিরই বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো আর্থিক দায় নেই। তাই অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান দুটিকে স্বতন্ত্রভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ
এদিকে টাকার অবমূল্যায়ন, ঋণের সুদ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্নে প্রকল্পটির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সাহেদ জাহিদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪,১৪৬ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭,১১৮ কোটি টাকায়।
কোম্পানির দাবি, ব্যয় বৃদ্ধির বড় একটি কারণ টাকার অবমূল্যায়ন। সিন্ডিকেটেড ঋণ অনুমোদনের সময় প্রতি ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮৬ টাকা, যা বর্তমানে প্রায় ১২৩ টাকা। এতে আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধযোগ্য অন্যান্য ব্যয়ের টাকার অঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জাহিদ বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং টাকার অবমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয় বেড়েছে।
তিনি জানান, অর্থায়ন সংকটে কাজ থমকে যাওয়ার আগে প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে তাদের ঋণের সুদহার প্রায় ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
কারখানাটি এখনও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে না পারায় কোনো পরিচালন আয় ছাড়াই প্রকল্পটিকে অর্থায়ন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। নির্মাণকাজ শেষ করা ও বন্দরে আটকে থাকা যন্ত্রপাতি খালাসে কোম্পানিটির আরও অর্থায়ন প্রয়োজন। অন্যদিকে বিলম্ব যত দীর্ঘ হচ্ছে, সুদ, ডেমারেজসহ প্রকল্পের অন্যান্য ব্যয়ও তত বাড়ছে।
ঝুঁকিতে বড় শিল্প বিনিয়োগ
কোম্পানির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় ৭০ একর জমিতে প্রকল্পটি গড়ে তোলা হচ্ছে। কারখানাটি চালু হলে বছরে ১২ লাখ ৫০ হাজার টন ইস্পাত উৎপাদনের পাশাপাশি প্রায় ৩,০০০ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হবে।
এ কারখানায় রিবার কয়েল ও ওয়্যার রডও উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে—যেসব পণ্য বাংলাদেশ বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আমদানি করে থাকে।
কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে বসুন্ধরা মাল্টি-স্টিল ইন্ড্রাস্ট্রিজ লি.-কে একক গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও অর্থায়ন নিয়ে চলমান অচলাবস্থা নিরসন না হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগস্ত হচ্ছে।
তাদের মতে, আংশিক নির্মিত একটি শিল্পপ্রকল্প, বন্দরে আটকে থাকা আমদানি করা যন্ত্রপাতি এবং ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধ ব্যয়—সব মিলিয়ে অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে প্রকল্পটিকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
