উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ত পানি বাড়াচ্ছে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি: গবেষণা
উপকূলীয় বাংলাদেশের খাবার পানিতে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততার পাশাপাশি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ছে। খুলনার কয়রা ও আশাশুনি উপজেলায় পরিচালিত এক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) সাসাকাওয়া মিলনায়তনে 'পানীয় জলের লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: বাংলাদেশের প্রমাণ ও নীতিগত সুপারিশ' শীর্ষক সেমিনারে গবেষণার এসব ফলাফল তুলে ধরা হয়। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সহযোগিতায় আইসিডিডিআর,বি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আইসিডিডিআর,বি-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক সায়েন্টিস্ট ড. আলিয়া নাহিদ সেমিনারে এনআইএইচআর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ সেন্টার ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ-এর বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেন।
গবেষণার আওতায় খুলনার কয়রা ও আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রামের পানির উৎসের লবণাক্ততা পরীক্ষা করা হয়। মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপের মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎস খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
এসব খাবার পানির উৎসের মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
ড. আলিয়া নাহিদ বলেন, উপকূলীয় বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য ব্যবহৃত পানিই এখন ক্রমশ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। খাবার পানিতে অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি হৃদরোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গর্ভাবস্থায় নারীরাও বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
গবেষণার আরেক অংশে কয়রা ও আশাশুনির ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্কের হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজনের আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি রয়েছে।
গবেষকদের হিসাবে, অংশগ্রহণকারীদের ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী ১০ বছরে হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি অন্তত ১০ শতাংশ। কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
গবেষণার ভিত্তিতে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সমন্বিত করে একটি হস্তক্ষেপমূলক কর্মসূচি তৈরি করা হয়েছে। এতে কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে কমিউনিটি সচেতনতা, পানির উৎসের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ রয়েছে।
কর্মসূচির আওতায় কমিউনিটি রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার ও টিউবওয়েলের পাশাপাশি খাবার পানির উৎসের একটি ডিজিটাল রেজিস্ট্রি ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের স্ক্রিনিং, রেফারেল, চিকিৎসা ও ফলো-আপ কার্যক্রমকে ডিজিটাল সেবার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সেমিনারে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য এখনো সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যভিত্তিক সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। পানিতে থাকা সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান কীভাবে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস পুকুর ও অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততার কারণ হতে পারে। তাই জলোচ্ছ্বাসের পর দ্রুত পানির উৎস পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধার এবং উপকূলীয় বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যের প্রভাবের সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশে তথ্য-প্রমাণ এখনও সীমিত। নিরাপদ খাবার পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণকে একসঙ্গে নিয়ে গবেষণা ও কার্যকর সমাধান তৈরিতে আইসিডিডিআর,বি কাজ করছে।
সেমিনারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য লবণাক্ততা ইতোমধ্যেই বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ আরও বাড়তে পারে। এ ধরনের গবেষণার তথ্য দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থাপনায় প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তের জন্য নিয়মিত পরিবীক্ষণ ও পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি বলেন, খাবার পানির মান বা প্রাপ্যতা একজন স্বাস্থ্যকর্মীর নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই লবণাক্ততা থেকে সৃষ্ট সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ শুধু স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, লবণাক্ততা ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বহু বছরের গবেষণালব্ধ প্রমাণ রয়েছে। এখন এসব প্রমাণকে বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা ও নীতিতে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সেমিনারে সরকার, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদান জোরদার, খাবার পানিতে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পানি ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একীভূত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
