বিন্না ঘাস কী? সাশ্রয়ী ও টেকসই উন্নয়নে কেন এর ব্যবহারে জোর দিচ্ছে সরকার?
বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটে কিংবা পরিত্যক্ত জমিতে অযত্নে বেড়ে ওঠা লম্বা এক ধরনের ঘাস আমাদের অতি পরিচিত। স্থানীয়ভাবে এটি বিন্না ঘাস বা বেন্না ঘাস নামে পরিচিত হলেও এর রয়েছে জাদুকরী গুণ। এই অবহেলিত ঘাসকেই এখন টেকসই উন্নয়নের বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মূলত পাহাড় ধস রোধ, নদী ভাঙন নিয়ন্ত্রণ এবং নবখননকৃত খালের স্থায়িত্ব বাড়াতে বিন্না ঘাসকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবহারের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে কোন কোন প্রকল্পে এই ঘাস ব্যবহার করা যায়, তা পর্যালোচনার জন্য সম্প্রতি একটি উচ্চপর্যায়ের 'টেকনিক্যাল কমিটি' গঠন করেছে সরকার। এই কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য ও পুরকৌশল বিভাগের গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শরীফুল ইসলামকে, যিনি গত দুই দশক ধরে এই ঘাস নিয়ে গবেষণা করছেন।
বিন্না ঘাস আসলে কী?
বিন্না ঘাস একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। এটি দেখতে লম্বা সরু পাতার ঘন ঝোপের মতো এবং উচ্চতায় দেড় থেকে তিন মিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই ঘাসের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে মাটির নিচে—এর শিকড়ে। অন্য সাধারণ ঘাসের শিকড় মাটির উপরিভাগে থাকলেও বিন্না ঘাসের শিকড় মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকদের মতে, চারা লাগানোর চার থেকে ছয় মাসের মধ্যেই এর শিকড় মাটির গভীরে পৌঁছে মাটিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে, যা ভূমিক্ষয় রোধে ঢাল হিসেবে কাজ করে।
কেন এই ঘাসের ব্যবহার বাড়াতে চায় সরকার?
বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন স্থানে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষার প্রবল স্রোতে এই খালগুলো পুনরায় ভরাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রে বাঁধ রক্ষা ও খাল ভরাট রোধে বিন্না ঘাস হতে পারে সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং টেকসই সমাধান। কংক্রিটের ব্লকের তুলনায় এটি অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব।
গত রবিবার 'বিন্না ঘাস পলিসি ফর বাংলাদেশ' শীর্ষক এক সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, 'নদী ভাঙন, ভূমিক্ষয় ও মাটির ক্ষয় রোধে বিন্না ঘাস একটি কার্যকর এবং স্বল্পব্যয়ী প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে। বিশেষ করে নদী ও খালের তীর, বাঁধ, পাহাড়ি ঢল এবং হাওর অঞ্চলে এই ঘাসের ব্যবহার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অবকাঠামোর স্থায়িত্ব বাড়াবে।'
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু কংক্রিটের ওপর নির্ভর না করে প্রকৃতিনির্ভর সমাধানে গুরুত্ব দিতে হবে। বিন্না ঘাস এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বজুড়ে ব্যবহার ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
শুধু বাংলাদেশেই নয়; থাইল্যান্ড, ভারত, চীন, ব্রাজিল ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে সড়ক ও নদীতীর সংরক্ষণে বাণিজ্যিকভাবে বিন্না ঘাস ব্যবহৃত হচ্ছে। অতিরিক্ত শীত কিংবা তীব্র খরতাপ—সব পরিবেশেই টিকে থাকার ক্ষমতা রয়েছে এই ঘাসের। প্রযুক্তির পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক মূল্যও অনেক। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে, বিন্না ঘাসের শিকড় থেকে সুগন্ধযুক্ত তেল পাওয়া যায়, যা দামি সুগন্ধি ও প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশে বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ধস প্রবণ এলাকা এবং পদ্মা-যমুনার মতো বড় নদীর ভাঙনপ্রবণ তীরগুলোতে এই ঘাস বনায়নের মাধ্যমে বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব বলে মনে করছেন গবেষকরা। সরকারের এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে এক নতুন যুগের সূচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
