এসডিজি অর্জনে ৪২১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি, বিকল্প অর্থায়নের দিকে এগোচ্ছে সরকার
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের সামনে ৪২১ বিলিয়ন ডলারের এক অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি মোকাবিলায় প্রচলিত সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি সরকার এখন বিকল্প অর্থায়নের দিকে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বুধবার (১২ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এসডিজিবিষয়ক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এসডিজি অর্জনে ৪২১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'ট্র্যাডিশনাল পাবলিক ফাইন্যান্সিংয়ের মধ্যে একটা সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা এখন অলটারনেটিভ ফাইন্যান্সিংয়ের কথা বলছি। কারণ গ্লোবালি পাবলিক ফাইন্যান্স আর্কিটেকচার পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।'
তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থায়ন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং বাংলাদেশ সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। মন্ত্রী আরও যোগ করেন, 'আমরা ইতিমধ্যে শেয়ারবাজার বা ক্যাপিটাল মার্কেটের বিষয়টি এগিয়ে নিচ্ছি। আমাদের ফরেন ফান্ড ম্যানেজাররা আসছেন। অনেকগুলো প্রোডাক্ট এখন আছে, যেগুলোর মাধ্যমে অলটারনেটিভ ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আমরা কিছুটা গ্যাপ পূরণ করতে পারব।' এছাড়া ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও বা রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমেও এই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
এসডিজি বাস্তবায়নে অংশীজনদের মতামত ও সুপারিশ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'বিভিন্ন সংযোগের মাধ্যমে যেগুলো আমরা নোট করেছি, এগুলো যদি ইতিমধ্যে আমাদের প্রোগ্রামের বাইরে কিছু থাকে, সেগুলো থেকে আমরা ইনকরপোরেট করি। আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করে, সবাইকে নিয়ে কাজ করি। আমি বক্তব্যে যেটা বললাম, সেটার অংশ হিসেবে এই কাজটা করা হয়েছে এবং এই কনসালটেশন প্রসেস চলতেই থাকে।'
এর আগে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম সাকী তার বক্তব্যে বলেন, এসডিজি অর্জনে ৪২১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি গুরুত্বারোপ করে বলেন, এসডিজি বাস্তবায়ন শুধু আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণ কিংবা প্রতিবেদন তৈরির বিষয় নয়, বরং মানুষের জীবনে সত্যিকারের উন্নতি ঘটানোই সরকারের মূল লক্ষ্য।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার কোনো ধরনের তথ্য বা উপাত্তের কারসাজি গ্রহণ করবে না। তিনি বলেন, 'অতীতে বাস্তবতা ও বিভিন্ন উপাত্ত-তথ্যের মধ্যে ব্যাপক ফারাক দেখা গেছে। প্রতিবেদন হতে হবে যথার্থ এবং দেশের প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরতে হবে। বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটি জেনে সেখান থেকে অগ্রগতি পরিমাপ করতে চায় সরকার।'
সম্মেলনে দেশের পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা জানান, এনআইডি না থাকায় তারা মৌলিক সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মিরপুর মাজার রোডের ভ্যানচালক মো. ওয়াসিম জানান, তার এলাকায় অনেক ছিন্নমূল মানুষের এনআইডি নেই। তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি রামিসা চৌধুরী এবং তরুণ প্রতিনিধি সোহানুর রহমান যথাক্রমে তাদের জনগোষ্ঠী ও বরিশালের মান্তা সম্প্রদায়ের এনআইডি বিড়ম্বনার কথা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের (জিআইইউ) যৌথ উদ্যোগে তিন দিনের এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে নাগরিক প্ল্যাটফর্মও সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল। সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, 'এই বাংলাদেশে যে কোনো মানুষকে, যে কোনো পরিচয়ের মানুষকে, যে কোনো অবস্থানের মানুষকে তার কণ্ঠস্বর চেপে রাখার কোনো সুযোগ আর নেই। আমরা যারা নাগরিক সমাজে কাজ করি, তাদের দায়িত্ব হলো এই কণ্ঠস্বর দেশ পরিচালনাকারীদের কাছে প্রতিনিয়ত পৌঁছে দেওয়া।'
সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নাগরিক সমাজ নিয়মিত নজরদারি করবে জানিয়ে তিনি বলেন, 'মন্ত্রী মহোদয় যে চ্যালেঞ্জ দিয়ে গেলেন, আমরা দেখব চার বছরে কতটা বাস্তবায়ন হয়। নাগরিক প্ল্যাটফর্মের 'রিফর্ম ট্র্যাকার' ও 'ম্যানিফেস্টো ওয়াচ'-এর মাধ্যমে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা হবে। বাংলাদেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা ও আস্থা রয়েছে, সেই প্রত্যাশা যেন হতাশায় পরিণত না হয়।'
এর মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
