তারেক রহমান: চেনা ছকের বাইরে এক প্রধানমন্ত্রী
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের কয়েক মাস আগে তারেক রহমান যখন নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন, তখন সামনে থেকে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তার মা, তৎকালীন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। দেশ ছাড়ার দিন এবং ১৭ বছর পর তার দেশে ফেরার দিনের মধ্যকার ব্যবধানটা ছিল আকাশপাতাল।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর হাসপাতালে জীবনের শেষ সময় পার করছিলেন তার মা। এদিকে তাকে স্বাগত জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন সারা দেশ থেকে আসা হাজার হাজার দলীয় নেতাকর্মী। বিমানবন্দর থেকে তারেক সরাসরি ঢাকার ৩০০ ফিট সড়কের সংবর্ধনাস্থলে যান। সেখানে তাকে স্বাগত জানায় এক জনসমুদ্র।
আওয়ামী লীগের প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলের বেশিরভাগ সময়ই তার মা হয় কারাগারে ছিলেন, নয়তো ভগ্নস্বাস্থ্যে ভুগেছেন। এই সময়ে প্রথমে দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান, পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে কার্যত তারেকই বিএনপির নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে তিনি হাল ধরেন। এমনকি মায়ের গুরুতর অসুস্থতা ও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও তার দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।
অবশেষে দেশে ফিরে তারেক এক তাৎক্ষণিক ও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন: দলের উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং ১২ ফেব্রুয়ারির গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়া। উচ্ছ্বসিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, 'আই হ্যাভ আ প্ল্যান।'
এর পাঁচ দিন পর মাকে হারান তারেক। তবে শোক পালনের জন্য সময় ছিল খুব সামান্যই। ভোটের আগে হাতে থাকা কয়েক সপ্তাহের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে তিনি বিরামহীন নির্বাচনি প্রচারণায় নেমে পড়েন।
নির্বাচনি প্রচারণায় নিজের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের রূপ তুলে ধরেন তারেক। বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা প্রতিশোধপরায়ণ ভাষার চর্চা থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। এর বদলে সম্প্রীতি ও ঐক্যের কথা বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
ব্যাপক প্রত্যাশা অনুযায়ীই, নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয় পায়, ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করেন তারেক।
নির্বাচনের পর বিজয়ী ও বিরোধী শিবিরের সম্পর্কের চিরচেনা রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যেও তারেক রহমান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে এক ভিন্ন শিষ্টাচারের পরিচয় দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসভবনে ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে সাক্ষাৎ করা রাজনৈতিক অঙ্গনে সৌহার্দ্যের বার্তা দিয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পর তার আরেকটি নতুন দিক উন্মোচিত হতে শুরু করেছে—বছরের পর বছর দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেই শুধু নয়, বরং প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও তিনি নেতৃত্বের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরন তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তার এসব প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে প্রটোকল কমানো, রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা হ্রাস ও সাধারণ মানুষের মাঝে—তা রাস্তায় হোক বা সরকারি অনুষ্ঠানে—মিলেমিশে থাকার দৃশ্যমান সদিচ্ছা।
ক্ষমতা ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব কমানো
নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি গাড়ির বদলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছেন। জ্বালানি, চালক ও বাসভবনের কর্মীদের ব্যয় নিজেই বহন করছেন। এছাড়া নিজ বেতনের ১০ শতাংশ জমা দিচ্ছেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে।
তিনি তার গাড়িবহর ও পুলিশ এসকর্টের আকারও ছোট করেছেন। আগে যেখানে ১৩ থেকে ১৪টি গাড়ির বহর থাকত, তা কমিয়ে চারটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। জনভোগান্তি এড়াতে প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের সময় রাস্তার দুই পাশে দীর্ঘক্ষণ সারিবদ্ধভাবে পুলিশ দাঁড় করিয়ে রাখার দীর্ঘদিনের প্রথা বিলুপ্ত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে তার দৈনন্দিন চলাচলে পুলিশের অতিরিক্ত এসকর্টও উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হয়েছে।
সংসদ সদস্যদের জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ি কেনার সুবিধা বাতিল করেছেন রারেক। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিএনপির সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা নেবেন না বলে সিদ্ধান্ত দেন তিনি।
২৫ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রী নিয়ে তুলনামূলক ছোট মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন তিনি। আর মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ বৈঠকই প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে বসেই করছেন।
সময় বাঁচানো ও যানজট কমানোর লক্ষ্যে তারেক রহমান মূলত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বদলে সকাল ৯টা থেকে সরাসরি সচিবালয়ে বসে তার দৈনন্দিন কাজ শুরু করেছেন।
সংসদীয় ও সরকারি ব্যয় কমাতে নৈশভোজ আয়োজন, আপ্যায়ন ব্যয় ও বিদেশ ভ্রমণের প্রতিনিধিদল ছোট করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অহেতুক বিদেশ ভ্রমণও আটকে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
আরেকটি প্রতীকী পরিবর্তন হলো সরকারি অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত ব্যানার ও ফেস্টুন থেকে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার বন্ধ করা। সরকারি অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙানোর প্রচলিত সংস্কৃতি বন্ধ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ভিআইপি প্রথা, দীর্ঘ বিশেষণসহ পরিচয় ঘোষণা ও ব্যক্তিবন্দনার নানা রীতিও বাতিল করা হয়েছে।
নীতি নির্ধারণ থেকে মাঠ পর্যায়ের তদারকি
কেবল অফিশিয়াল প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি জনসেবামূলক কাজগুলো পরিদর্শনের প্রবণতা তারেকের মধ্যে প্রবল।
কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই নিজে গাড়ি চালিয়ে চার ঘণ্টা ঢাকার পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ড্রেজিং পরিস্থিতি তদারকি করেছেন তিনি। সচিবালয়ে এক ভবন থেকে আরেক ভবনে হেঁটে হেঁটে হঠাৎ কর্মচারীদের রুমে গিয়ে করমর্দন করেন।
খাল পুনঃখনন একটি কর্মসূচির অংশ নিয়ে তিনি নিজেই কোদাল হাতে নিয়ে অন্যদের উৎসাহিত করেছেন।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতিও নিরুৎসাহিত করেছে বর্তমান সরকার।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল পুনঃখনন কর্মসূচিসহ নিজের বেশ কয়েকটি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারেক দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন।
নির্বাচনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, গত ১০ মার্চ ঢাকার কড়াইল বস্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি চালু করা হয়। পাইলট পর্যায়ে উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলেও সরকারের প্রথম বাজেটেই ফ্যামিলি কার্ডের ব্যাপ্তি বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং দেশজুড়ে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি পুরোদমে বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
১৪ এপ্রিল টাঙ্গাইলে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষক কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে এই কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়। বাজেটে এ কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রবাসী কার্ড, ই-হেলথ কার্ড দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে সরকারের।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ হিসেবে ১০ মার্চ সরকার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করেন।
সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে ৫৩টি খালের পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তারেক। এ কর্মসূচিকে জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সরকারের পরিকল্পনায় কৃষি, সেচ, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ, মাছ চাষ ও স্থানীয় অর্থনীতিকে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সারা দেশের ইমাম-মোয়াজ্জিনসহ অন্য ধর্মের উপসনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সরকারি ভাতার আওতায় আনা হয় সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করেছে। উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন এবং বন্ধ থাকা ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের দিকেও সরকার মনোযোগ দিচ্ছে।
জনজীবনে দৃশ্যমান উপস্থিতি
আনুষ্ঠানিক সরকারি কার্যক্রমের বাইরেও নিজেকে জনসাধারণের কাছে সহজে পৌঁছানোর মতো মানুষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তারেক।
মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে তিনি প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখতে যান ও সাধারণ দর্শকের সারিতে বসে সিনেমা উপভোগ করেন। এ সময় কোনো বিশেষ ব্যবস্থার সুবিধা না নিয়ে তিনি ব্যক্তিগত খরচে সাধারণ মানের ১৫০ টাকার খাবার খান।
মিরপুরে পল্লবীতে শিশু রমিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হলে ২১ মে রামিসার বাসায় ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন, তাদের সান্ত্বনা দেন এবং হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রকাশ্যে তরুণ উদ্ভাবকদেরও সমর্থন জুগিয়েছেন তারেক রহমান। গত ৯ মে ১৭ বছর বয়সি ওয়াকিমুলের তৈরি দেশীয় প্রযুক্তির স্মার্ট কার চালিয়ে তার উদ্ভাবনের প্রশংসা করেন এবং কম খরচে আরও উন্নত গাড়ি তৈরিতে সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
২৩ মে তেজগাঁওয়ে স্থানীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) নিজে চালিয়ে দেখে সবুজ প্রযুক্তি ও দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করার বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটে ইভি উৎপাদনে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে বিএনপি সরকার।
বিশ্লেষকরা যা বলছেন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও একাডেমিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে দূরত্ব কমানোর একটি দৃশ্যমান প্রচেষ্টা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার ওপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ টিবিএসকে বলেন, 'দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে তারেক রহমান তার দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখিয়েছেন।'
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী আরও বেশি মানবিক ধরনের নেতৃত্ব প্রদর্শনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও নিচ্ছেন, যার সুফল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
তবে দেশের রাজনৈতিক ও অন্যান্য সংকট মোকাবিলায় সরকারকে আরও সক্রিয় হতে হবে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক সাব্বির।
তিনি আরও বলেন, তারেক রহমানের কূটনৈতিক দক্ষতা মূল্যায়ন করার সময় এখনও আসেনি, কারণ তিনি খুব বেশি বিদেশ সফর করেননি। তবে তার সফলতার সম্ভাবনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই অধ্যাপক।
