কার্গো ভিড়তে না পারা ও এফএসআরইউয়ের ত্রুটিতে কমেছে এলএনজি সরবরাহ, বেড়েছে গ্যাস সংকট
সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে একটি জাহাজ ভিড়তে না পারা ও মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) নতুন করে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় গতকাল (১৪ আগস্ট) জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হলেও আবাসিক, শিল্পকারখানা ও পরিবহন খাতে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মস-টাইপ এলএনজি পরিবাহী জাহাজ আল হামরা গত তিন দিন ধরে বঙ্গোপসাগরে অপেক্ষমাণ থাকলেও এক্সিলারেট এনার্জি সেটিকে সামিটের এফএসআরইউতে ভেড়ার অনুমতি দেয়নি। এই টার্মিনালের কারিগরি কার্যক্রম পরিচালনা করে এক্সিলারেট এনার্জি।
কর্মকর্তারা জানান, এখন জাহাজ ভেড়ানোর অনুকূল আবহাওয়া থাকায় তারা আশা করেছিলেন, আগেরদিন রাতের মধ্যে মেমব্রেন-টাইপ আরেকটি জাহাজ টার্মিনালে নোঙর করবে। ফতে এলএনজি খালাস শুরু করা যাবে এবং গতকাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
তবে সামিট পাওয়ার বলেছে, তাদের টার্মিনালটি রিগ্যাসিফিকেশনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ও সচল রয়েছে এবং টার্মিনালটি বন্ধ নেই।
গতকাল বিকাল ৪টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে এক্সিলারেট পরিচালিত এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়। বন্ধ হওয়ার আগে টার্মিনালটি জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করছিল। রাত ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত এর কার্যক্রম পুনরায় চালু করা যায়নি।
পেট্রোবাংলার প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট ডিভিশনের পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব টিবিএসকে টার্মিনালটি বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শিগগিরই এফএসআরইউটির কার্যক্রম চালুর আশা করা হচ্ছে। তবে তিনি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি।
এর আগে ২১ জুলাই জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের সময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর টার্মিনালটি দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় কার্যত বন্ধ থাকার পর ৬ আগস্ট ফের আংশিক চালু হয়।
আগুনে টার্মিনালের বয়লার পরিচালনাসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শুরুতে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে একটি বয়লার ব্যবহার করে টার্মিনালটি ধীরে ধীরে সরবরাহ শুরু করলেও নতুন করে দেখা দেওয়া এই কারিগরি ত্রুটি আগে থেকেই চাপে থাকা এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুনরায় ব্যাহত করেছে।
আল হামরা পরিস্থিতি
সমুদ্রে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মেরিনট্রাফিকের তথ্যমতে, আল হামরা কয়েক দিন ধরে সমুদ্র উপকূলে অপেক্ষমাণ রয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেন, সামিটের টার্মিনালের কারিগরি দিক দেখভালকারী প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি জাহাজটির ধরনের সাথে টার্মিনালের উপযোগিতা-সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা জানিয়ে সেটিকে ভেড়ার অনুমতি দেয়নি বলে জানা গেছে।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, জাহাজটিকে কেন ভিড়তে দেওয়া হয়নি, তার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, সামিট ও এক্সিলারেট পরিচালিত এফএসআরইউগুলোর নকশা শিল্পের মানদণ্ড অনুযায়ী করা হয়েছে। এগুলো জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে মস-টাইপ ও মেমব্রেন-টাইপ উভয় ধরনের এলএনজি পরিবাহী জাহাজই সামলাতে সক্ষম।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়ার সাথে যোগাযোগ করেছিল টিবিএস। তবে তিনি একটি সভায় আছেন জানিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের মহাব্যবস্থাপক মোহসিনা হাসান টিবিএসকে বলেন, কোম্পানির এলএনজি টার্মিনালটি রিগ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ও সচল রয়েছে। তিনি বলেন, 'সামিটের এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল এবং গ্যাস রূপান্তরের জন্য প্রস্তুত আছে। টার্মিনালটি কোনোভাবেই বন্ধ করা হয়নি।'
সামিটের এফএসআরইউয়ের রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজি কার্গোর সঙ্গে এফএসআরইউকে সংযুক্ত করতে না পারায় গত পরশু বিকাল থেকে টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে, যা চলমান গ্যাস সংকট নিরসনে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিছুটা স্বস্তি এনেছে বিডব্লিউ লেসমেস
সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের মহাব্যবস্থাপক মোহসিনা হাসান বলেন, বিডব্লিউ লেসমেস নামের আরেকটি জাহাজ এলএনজি নিয়ে গতকাল দেশে পৌঁছেছে এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালে নোঙর করেছে।
জাহাজটি পৌঁছানোর পর সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে টার্মিনালটি থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট রিগ্যাসিফাইড তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (আরএলএনজি) সরবরাহ শুরু হয়। এতে চলমান গ্যাস সংকটের মাঝে সরবরাহে কিছুটা গতি এসেছে।
আশা করা হচ্ছে, ১৫ আগস্ট রাত ২টার দিকে পর্যায়ক্রমে এই সরবরাহ বেড়ে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাবে। এতে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য গ্রাহকদের জন্য গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়বে।
সামিটের কর্মকর্তারা বলেন, টার্মিনাল ও জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থার কারিগরি সক্ষমতার মধ্যে থেকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য কার্যক্রম পরিচালনা এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ গ্যাস সরবরাহে তাদের প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং গ্যাস সংকট নিরসনে তারা পেট্রোবাংলা ও সরকারের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাবে বলেও উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি
এলএনজি সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া সত্ত্বেও, সরকার বর্তমানে মজুত থাকা গ্যাসের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বরাদ্দ করায় গতকাল দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলেন, বিদ্যুৎ খাত গতকাল প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে। এই পরিমাণ গ্যাস মূলত গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের আগে সরবরাহ করা পরিমাণের প্রায় সমান।
দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে এলএনজিসহ পেট্রোবাংলা সরবরাহ করেছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস; ফলে প্রায় ৫০ শতাংশ ঘাটতি রয়ে গেছে। তবে এই সরবরাহকৃত গ্যাসের প্রায় অর্ধেকই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দেওয়া হয়েছে, যা লোডশেডিং কমাতে সাহায্য করেছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য বলছে, গত কয়েক দিনের তুলনায় দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। গত কয়েক দিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছিল।
দিবাগত রাত ১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি থাকায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। তবে ভোরের পর থেকে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে। সকাল ৬টায় লোডশেডিং কমে দাঁড়ায় ৬৬৯ মেগাওয়াটে, সকাল ৭টায় ৩০৪ মেগাওয়াট ও সকাল ৮টায় ১৮৫ মেগাওয়াটে নেমে আসে। এরপর সকাল ১০টার মধ্যে লোডশেডিং পুরোপুরি শূন্যে নেমে আসে।
দিনের বেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা মূলত স্বাভাবিক ছিল; দুপুর ও বিকেলের দিকে কার্যত কোনো লোডশেডিং হয়নি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বলছে, এই উন্নতির কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং আদানি পাওয়ার থেকে ফের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়া। পাওয়ার গ্রিডের তথ্যানুসারে, ১৩ আগস্টের বেশিরভাগ সময় আদানি পাওয়ার যেখানে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছিল, সেখানে ১৪ আগস্ট সরবরাহ করেছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি।
গ্যাস রেশনিংয়ের প্রভাব আবাসিকে
বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রভাব পড়েছে অন্যান্য খাতের গ্রাহকদের।
অনেক এলাকাতেই আবাসিক সংযোগ, সিএনজি স্টেশন, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্যাসের চাপ মারাত্মক কমে গেছে।
সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। এমনকি গ্যাস সংকটে জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহের দাবিতে চালকেরা কিছু কিছু জায়গায় সড়ক অবরোধও করেছেন।
এ সংকটের প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পগুলোতেও পড়তে শুরু করেছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকা এবং দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চাল, চিনি ও আটা-ময়দার কলগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ সংকটের প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) মাত্র ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে, যেখানে নগরীর দৈনিক ন্যূনতম চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ৪৩ শতাংশ। ফলে দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে ২১ জুলাই থেকেই চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে কমছে। সে সময় নগরীটি দৈনিক প্রায় ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাচ্ছিল, পরবর্তীতে তা কমে ২৩০ মিলিয়ন এবং কখনো কখনো ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। আর বর্তমানে তা কমে মাত্র ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে ঠেকেছে।
শিল্প পুলিশ-৩-এর (চট্টগ্রাম) পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম জানান, জেলার শিল্পাঞ্চলগুলোতে ১ হাজার ৭৭৮টি কারখানা আছে। তিনি বলেন, 'এক সপ্তাহ আগের হিসাব অনুযায়ী, গ্যাস সংকটের কারণে চারটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আরও ১৪টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। এরপর থেকে পরিস্থিতির হয়তো আরও অবনতি হয়েছে।'
