উন্নয়নের জন্য ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহারে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ সরকারের
২০০১ সালে দেশের নগর জনসংখ্যা ২৩.৩ শতাংশ থাকলেও বেড়ে ২০২১ সালে ৩১.৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৩৮.২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন মোকাবিলা এবং কৃষিজমি হ্রাস রোধ করতে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা হলো একটি সুসংগঠিত, সমন্বিত ও তথ্য-প্রমাণভিত্তিক উন্নয়ন কাঠামো। এর মূল কাজ হলো দেশের ভূমি, অবকাঠামো, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পরিবেশের সর্বোত্তম ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা ।
২০২৬ থেকে ২০৫৬ সাল পর্যন্ত ৩০ বছর মেয়াদি এ পরিকল্পনায় বাংলাদেশের সমগ্র ভূখণ্ড এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এ পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে ৪৬৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর (ইউডিডি)। সম্প্রতি প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে এ পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
ইউডিডি কর্মকর্তারা জানান, পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার জন্য প্রতি পাঁচ বছর পরপর পরিকল্পনাটি পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হবে।
তারা বলেন, জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা ধারণগতভাবে জাতীয় আঞ্চলিক ও স্থানীয় পরিকল্পনা স্তরকে অন্তর্ভুক্ত করে। তবে এর প্রথম পর্যায় শুধু জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে।
ইউডিডির পরিকল্পনাবিদ ফৌজিয়া শারমিন তিথি বলেন, দেশে প্রায়ই বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা আলাদাভাবে করা হয়। এগুলোকে যুক্ত করার জন্য কোনো জাতীয় কাঠামো থাকে না।
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে সড়ক নিজের মতো, রেলওয়ে নিজের মতো পরিকল্পনা করছে। কিন্তু একটি জাতীয় কাঠামোর মধ্যে সংযোগ নেই। এই সমন্বয় আনতেই আমরা জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার উদ্যোগ নিয়েছি।'
ফৌজিয়া শারমিন আরও বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কেমন হওয়া উচিত, তার একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যাবে প্রস্তাবিত পরিকল্পনার মাধ্যমে। কোথায় শিল্পাঞ্চল হবে, কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় ভবিষ্যতে রেল বা মেট্রোরেল যাবে—এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে এ পরিকল্পনায়। এতে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন আরও কার্যকর হবে।
এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, 'আমরা মূলত সমন্বয় ও মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকব। বাস্তবায়ন করবে সংশ্লিষ্ট খাতভিত্তিক সংস্থাগুলো, যেমন সড়ক প্রকল্প হলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করবে।'
পরিকল্পনার আইনি কাঠামো
দেশজুড়ে অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্ধে এবং স্থানীয় ও জাতীয় পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় আনতে ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা আইন ২০২৬ বিল আকারে পাশ হয়েছে।
বৈষম্যহীন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে গঠিত সরকারের একটি টাস্কফোর্স ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যে প্রতিবেদনের প্রকাশ করে, সেখানেও জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে নগরায়ণ ও ভূমির ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে যুক্তরাজ্যের টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং অ্যাক্টের মতো আধুনিক আইনি কাঠামো পাশের সুপারিশও করে টাস্কফোর্স।
পরিকল্পনা প্রয়োজন যে কারণে
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দ্রুত নগরায়ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ কাঠামোর প্রেক্ষাপটে বিশৃঙ্খলা এড়াতে সারা দেশে একটি আধুনিক ও সুসংহত স্থানিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। ২০০১ সালে নগর জনসংখ্যা ছিল ২৩.৩ শতাংশ, যা ২০২১ সালে বেড়ে ৩১.৬৬ শতাংশে দাঁড়ায়। পূর্বাভাস রয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই হার ৩৮.২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
বর্তমানে সারা দেশে জনসংখ্যার ঘনত্বে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। ঢাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩ হাজার ২৩৪ জন লোক বাস করলেও বরিশালে এই সংখ্যা ৯২৩ ও রাঙামাটিতে ৯৭ জন। এই বৈষম্য নগর ব্যবস্থার ওপর ক্রমশ চাপ বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি সামলাতে নগর কেন্দ্রগুলোর শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ ও অঞ্চলভিত্তিক সুপরিকল্পিত অভিবাসন বাস্তবায়নে কৌশলগত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দেশের জিডিপিতে নগর অঞ্চলের অবদান বর্তমানে ৬৫ শতাংশের বেশি, যা প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্ক ও পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
অন্যদিকে কৃষিশুমারি ২০১৯ অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ০.১৯ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষিজমি সংরক্ষণ, শস্য-উপযোগী অঞ্চল নির্ধারণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি খাত উৎসাহিত করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে ১৮৫টি প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ৩.৮৭ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার আওতায় টেকসই অবকাঠামো তৈরি ও বন উজাড় প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, যত দ্রুত এই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা যাবে, তত দ্রুত অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
'এটি উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করবে' উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্থানিক পরিকল্পনা শুধু একটি নীতিগত দলিল নয়, বরং দেশের সার্বিক উন্নয়ন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
অগ্রাধিকার পাওয়া প্রধান খাতসমূহ
কর্মকর্তারা জানান, এই পরিকল্পনায় তিনটি প্রধান স্তর থাকবে। প্রথমত, জাতীয় উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও রূপকল্; দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র ও আঞ্চলিক করিডোরগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা প্রস্তুত; এবং তৃতীয়ত, ভূমি ব্যবহার নির্দেশিকা ও বিনিয়োগের অগ্রাধিকার সংবলিত একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় পরিকল্পিত নগরায়ণ, টেকসই শিল্পায়ন, কৃষিজমি সুরক্ষার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ ও সড়ক-রেল-নৌপথের সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভূমি ব্যবহারে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে এটি জিআইএস-ভিত্তিক ম্যাপিং ব্যবহার করবে।
এ পরিকল্পনায় ঢাকাকেন্দ্রিক জনসংখ্যার চাপ কমানো এবং বিকেন্দ্রীভূত নগরায়ণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতীয় শিল্প নীতি ২০২২ ও অর্থনৈতিক অঞ্চল আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিল্প খাতে বৈচিত্র্য আনার কৌশল রাখা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি নতুন ও উদীয়মান শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষিজমি রক্ষায় কঠোর নির্দেশনা, বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর আলোকে ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় টেকসই কৃষি ও নির্দিষ্ট কৃষি অঞ্চল সংরক্ষণের উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এ পরিকল্পনায়। এছাড়াও এতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০২৫ অনুসরণ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে কৌশলগত অবকাঠামো উন্নয়নের দিকনির্দেশনা থাকবে।
সারা বছর যোগাযোগ নিশ্চিত করতে প্রতি বছর ৫ হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন ৩০ হাজার মিটার সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এতে।
