ওয়ান ইলেভেনের সময় তারেক রহমানকে ডিজিএফআইয়ের ‘আয়নাঘরে’ বন্দি রাখা হয়েছিল: চিফ প্রসিকিউটর
ওয়ান ইলেভেনের সময় তারেক রহমানকে ডিজিএফআইয়ের 'আয়নাঘরে' বন্দি রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা সেনানিবাসে ডিজিএফআইয়ের 'জেআইসি সেল' নামের গোপন বন্দিশালা বা 'আয়নাঘর' পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'আমরা আজকে আমাদের বিচারের অংশ হিসেবে ডিজিএফআইয়ের কমপ্লেক্সের ভেতরে জেআইসি... এটি টর্চার সেল, 'আয়নাঘর' হিসেবে পরিচিত... সেই জেআইসি পরিদর্শনে তিনজন বিচারপতি, সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী, আমাদের প্রসিকিউশন টিমের সদস্য উপস্থিত ছিলাম। আমাদের ডিফেন্স টিমের আইনজীবী বন্ধুরাও উপস্থিত ছিলেন। সবাই আমরা আমাদের বিচারপতিদের নেতৃত্বে এই জেআইসিটি পরিদর্শন করেছি।'
তিনি বলেন, 'জেআইসি ছিল মানুষকে ধরে এনে বন্দি রেখে তাদের ওপর অত্যাচার এবং নির্যাতনের একটা সেল, যেটা পরে সর্বজন পরিচিত 'আয়নাঘর' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সেখানে কী অমানবিকভাবে বন্দিদের ধরে এনে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর রাখা হয়েছে, সেই নির্মম চিত্র আজকে এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে কিছুটা অনুভব করা গেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আজকে যে জেআইসি, এখানে কিন্তু ব্রিগেডিয়ার আজমীসহ বন্দিদের এই জেআইসিতে রাখা হয়েছে। দিনের পর দিন তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'আরও একটি বিষয় দেখবেন, এক-এগারোর সময় আজকের প্রধানমন্ত্রী... আজকে যে জেআইসি সেলটি আমরা পরিদর্শন করেছি, তারই কোনো একটি কামরায় তাকেও কিন্তু আনা হয়েছে। তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছিল। আমাদের ইনভেস্টিগেশনে বিভিন্ন সাক্ষীদের মুখের বর্ণনা থেকে সেই তথ্য পাওয়া গেছে এবং পর্যায়ক্রমে এগুলো বিচারের রিফ্লেকশন হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'বিগত সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি অমানবিক রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছিল। যেখানে কিছুসংখ্যক অতি উৎসাহী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সরকারের কিছু অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এই আয়নাঘর নামে টর্চার সেলগুলো বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠনের নেতা, যারা মত-পথের ভিন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তাদের ধরে এনে অনেক মানুষকে সেখান থেকে পরে গুম করা হয়েছে। সেই গুমের অনেক ভিকটিমদের আমরা কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের হদিস পাইনি। অনেক ভিকটিমদের সেখানে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে। তাদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়েছে।'
তাজুল ইসলাম বলেন, 'আপনারা ইতোমধ্যে জানবেন যে, এই ডিজিএফআই এবং জেআইসি সেলের সম্পৃক্ত যেসব কর্মকর্তারা ছিল, তাদের অনেককেই বিচারের আওতায় আনা হয়েছে এবং তাদের বিচার চলছে। ভবিষ্যতেও যাদের সংশ্লিষ্টতা এভাবে পাওয়া যাবে, তাদেরও এই অমানবিক ঘটনার জন্য বিচারের সম্মুখীন করা হবে।'
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'হুম্মাম কাদের চৌধুরী, তাকেও কিন্তু এই জেআইসি সেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তিনি কতদিন বন্দি ছিলেন, তার নিজের হাতের একটা লেখা ছিল এবং এইচ কিউ সি নামে একটা ব্যাপার ছিল, সেটি কিন্তু তারা সাদা রং করে প্লাস্টার করে দিয়েছে। প্লাস্টারের পরেও তার এই লেখাটা জেআইসি সেলের একটি রুমের মধ্যে বিদ্যমান আছে এবং সেখানে হুম্মাম কাদের চৌধুরীর বর্ণনা থেকে কিন্তু আমরা এটা পেয়েছি।'
তিনি বলেন, 'তার (হুম্মাম) বর্ণনার সঙ্গে জেআইসিতে যে রুমটি, এটার হুবহু মিল পাওয়া গেছে। আমরা এগুলো সিলগালা করে রেখেছি। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত হয়তো এগুলো আমাদের কাস্টডিতে থাকবে।'
ঢাকা সেনানিবাসে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সদর দপ্তরে থাকা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারের (জেআইসি) গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন বিচারপতি। ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজার নেতৃত্বে এই পরিদর্শন দলে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও।
এর আগে, গত শনিবার উত্তরায় র্যাব পরিচালিত বন্দিশালা বা গুমঘর পরিদর্শন করেন তারা।
প্রসিকিউশন জানায়, র্যাব ও ডিজিএফআই পরিচালিত বন্দিশালায় গুম করে রাখার অভিযোগে দুটি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। এই বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এসব বন্দিশালা পরিদর্শন করছেন বিচারপতিরা।
