জুলাই হত্যা মামলা: হাসিনাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, আরও ৪৯ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ
জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকার মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকায় রাকিবুল হোসেন (২৯) নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এছাড়া ৪৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. মমিনুল ইসলাম গত ১৩ জুলাই আদালতে এ অভিযোগপত্র জমা দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ঘটনার বিষয়ে তদন্ত শেষে সার্বিক পর্যালোচনায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঘটনার সময় মিরপুর এলাকায় ছিলেন না—এমন ৪৯ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রভুক্ত অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিল, কামাল আহমেদ মজুমদার, ইলিয়াস মোল্লা, মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, এখলাস উদ্দিন মোল্লা, সাবেক কাউন্সিলর কাসেম মোল্লা প্রমুখ।
অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক এমপি ও আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান, কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক এমপি কামরুল আরেফিন, পাবনা-৪ আসনের সাবেক এমপি গালিবুর রহমান শরিফ, আলোক হেলথকেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. লোকমান হোসেন, গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ইলিয়াস আহমেদ তালুকদারসহ আরও অনেকে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালের ১২ জুলাই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ৫ জুন উচ্চ আদালত সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের ওই প্রজ্ঞাপন অবৈধ ঘোষণা করলে কোটা পদ্ধতি নিয়ে পুনরায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। উচ্চ আদালতের এ সিদ্ধান্তের পর কোটা সংস্কার আন্দোলনের নতুন সূচনা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে আন্দোলন শুরু করেন। এ আন্দোলন রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, এই কোটাবিরোধী আন্দোলন দমনের জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা নিরস্ত্র কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য আন্দোলন প্রতিহত করতে দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন অপচেষ্টায় লিপ্ত হন। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি সরাসরি না মেনে নানা কৌশল অবলম্বন করে এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সামনে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে থাকে। ফলশ্রুতিতে এ আন্দোলন বিপ্লবে রূপ নেয়।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, এজাহারনামীয় আসামি শেখ হাসিনার সঙ্গে অভিযোগপত্রভুক্ত অপর আসামিরা গোপন বৈঠক করে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের জন্য আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশনা দেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতারা এবং পুলিশ কর্মকর্তারা ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের জন্য সারা বাংলাদেশ, বিশেষ করে মিরপুরের ছাত্র-জনতাকে দমন করতে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। আসামিরা ষড়যন্ত্র করে সারা দেশে ছাত্র-জনতার যৌক্তিক আন্দোলনকে সহিংসভাবে থামানোর লক্ষ্যে সচেষ্ট ছিলেন। তদন্তকালে ভিকটিমের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করানোর জন্য আদালতে আবেদন করা হয়।
আদালতের আদেশে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ নিয়ম মাফিক লাশ উত্তোলনের জন্য ভিকটিমের কবরস্থানে যাওয়া হয়। তবে পরিবারের সদস্য ও এলাকার লোকজনের প্রচণ্ড আপত্তির কারণে কবর থেকে ভিকটিমের লাশ উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।
মামলার অভিযোগসূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই আন্দোলনে অংশ নেন রাকিবুল। ওই দিন রাত ৯টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি মিছিল মিরপুর-১০ গোলচত্বরে পৌঁছালে আসামিদের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। এরই প্রেক্ষিতে অজ্ঞাত আসামির ছোড়া বুলেটে রাকিবুল হোসেন (২৯) গলার বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে ড. আজমল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক রাত ৯টা ১৫ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় গত ২০ সেপ্টেম্বর মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেন নিহতের বাবা মো. আবু বক্কর সিদ্দিক।
