দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ছে: আইএমইডি
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতাধীন প্রকল্পগুলো সময়মতো, ব্যয় সাশ্রয়ী ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়নের পথে ১৮টি প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে সরকার এবং সেগুলো মোকাবিলায় একগুচ্ছ নীতিগত সুপারিশও করা হয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, অপর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, দুর্বল বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের ত্রুটি।
আইএমইডি জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধি কমানো, দক্ষতা বাড়ানো এবং জবাবদিহিতা জোরদারের লক্ষ্যেই এসব সুপারিশ করা হয়েছে।
গতকাল (২৮ আগস্ট) শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
দুর্বল সমীক্ষা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থায়ন পরিকল্পনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক প্রকল্পে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, স্বাধীন পরামর্শকের অংশগ্রহণ কিংবা যথাযথ মান যাচাই ছাড়াই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হয়। ফলে বাস্তবায়নের সময় নকশা পরিবর্তন করতে হয় এবং এতে ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং বারবার প্রকল্প সংশোধনের প্রয়োজন হয়।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাধ্যতামূলক পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনার সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
প্রতিবেদনে দুর্বল অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং প্রকল্প-পরবর্তী মূল্যায়নের অভাবকে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গ্রহণযোগ্য মূল্যায়ন ছাড়াই অনেক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে সরকারি সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার হয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জিত হয় না।
আইএমইডি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বাস্তবসম্মত অনুমান ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর বাধ্যতামূলক অর্থনৈতিক মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে।
আইএমইডি দুর্বল অর্থায়ন পরিকল্পনা এবং বাজেটের সঙ্গে অসামঞ্জস্যকেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটি বলেছে, অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত হওয়ার আগেই অনেক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
কর্মকর্তারা জানান, বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে এ ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনের তিন বছর পর চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে।
প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের দুর্বলতাকেও বারবার দেখা দেওয়া একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। প্রকল্প অনুমোদনের আগে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও কারিগরি মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
ক্লাস্টার বা আমব্রেলা প্রকল্পে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরেছে আইএমইডি। এ ধরনের প্রকল্পের শুরুতেই একটি 'লিড মিনিস্ট্রি' নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বিলম্ব, জনবলের অসামঞ্জস্য
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ বা অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হয় না। আবার কিছু প্রকল্প চার বা পাঁচবার পর্যন্ত সংশোধন করতে হয়।
আইএমইডি সর্বোচ্চ দুইবার প্রকল্প সংশোধন এবং ব্যয় না বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দুইবার মেয়াদ বাড়ানোর সীমা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমে যায়। এ জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর অন্তত ছয় মাস আগে রাজস্ব বাজেটের আওতায় প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি এবং তিন মাসের মধ্যে সেসব পদে জনবল নিয়োগের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
অন্যান্য সুপারিশ
সব উন্নয়ন প্রকল্পে 'ক্লাইমেট রিস্ক স্ক্রিনিং' এবং 'ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট' বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে আইএমইডি।
কর্মকর্তারা বলেন, রাজস্ব বাজেট থেকে পরিচালিত হওয়ার কথা এমন অনেক নিয়মিত কার্যক্রম অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পাওয়ার জন্য উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়।
প্রতিবেদনে নিয়মিত সরকারি কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়নের প্রচলন বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একজন কর্মকর্তা শুধু একটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন—এ বিধান নিয়মিতই উপেক্ষিত হয়। এ ক্ষেত্রে 'এক প্রকল্প, এক প্রকল্প পরিচালক' নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের প্রথা বন্ধ এবং প্রকল্পের ধরন ও জটিলতা অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়ার জন্য যোগ্য প্রকল্প পরিচালকদের একটি 'প্রজেক্ট ডিরেক্টর পুল' গঠনের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
এছাড়া সব প্রকল্পে 'রেজাল্ট-বেইজড ম্যানেজমেন্ট (আরবিএম)' বাধ্যতামূলক করা, প্রকল্প শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) জমা নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময় বিবেচনায় রেখে বাস্তবসম্মত বাস্তবায়নকাল নির্ধারণের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
