প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে নতুন খসড়া নীতিমালা; সুযোগ পাবেন বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞ, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা
খসড়া নীতিমালায় বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞ, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকার একটি নতুন খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ পেশাজীবী এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনা বিভাগের প্রণীত 'খসড়া প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ নীতিমালা-২০২৬'-এ প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া নীতিমালায় ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রতিটি প্রকল্পের জন্য পৃথক প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে একজন ব্যক্তি যাতে একই সময়ে একাধিক এমন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, সে বিধানও রাখা হয়েছে।
তবে বিশেষায়িত প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্যতার কিছু শর্ত শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বয়সসীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক পদে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়স ৬৫ বছর এবং উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) ও সহকারী প্রকল্প পরিচালক (এপিডি) পদে আবেদনের জন্য সর্বনিম্ন বয়স ২৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা বিভাগ সম্প্রতি খসড়া নীতিমালাটি প্রস্তুত করেছে এবং এটি চূড়ান্ত করার আগে মতামতের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠিয়েছে।
প্রকল্পের আকার অনুযায়ী বেতন
প্রস্তাবিত নীতিমালায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন-ভাতা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকরা মাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত সম্মানী পেতে পারেন। আর এর চেয়ে বড় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকদের জন্য সর্বোচ্চ ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত সম্মানীর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ভ্যাট ও কর প্রকল্প ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
নীতিমালায় সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতের যোগ্য পেশাজীবীদের জন্য আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অডিট ও ক্রয় কার্যক্রমে দক্ষ সরকারি কর্মকর্তারা লিয়েনে আবেদন করতে পারবেন। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারাও আবেদন করার যোগ্য হবেন।
এ ক্ষেত্রে লিয়েনে আবেদন বলতে বোঝানো হয়েছে, একজন সরকারি কর্মকর্তা সাময়িকভাবে কোনো প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তবে তার মূল সরকারি পদে ফিরে যাওয়ার আইনগত অধিকার বহাল থাকবে এবং এতে তার জ্যেষ্ঠতা বা চাকরির অন্যান্য সুবিধা ক্ষুণ্ন হবে না।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কারিগরি জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ পেশাজীবীরাও আবেদন করতে পারবেন।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রয়বিধি, প্রোকিউরমেন্ট ব্যবস্থাপনা এবং ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রোকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থা বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক কাজ, ভূমি অধিগ্রহণ আইন এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেওয়া হবে। পাশাপাশি আগে প্রকল্প পরিচালক (পিডি), উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) বা সহকারী প্রকল্প পরিচালক (এপিডি) হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে তা অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে গণ্য হবে।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ বলেন, 'যদি সত্যিকার অর্থে যোগ্য, দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এর ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে। অন্যথায় এর নেতিবাচক প্রভাবই বেশি হবে।'
তিনি প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেন, উচ্চ বেতন দিলেই যে ভালো কর্মদক্ষতা নিশ্চিত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তিনি বলেন, 'অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কিছু ব্যাংকে উচ্চ বেতনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের দায়িত্বকালেই বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। শুধু বেশি বেতন দিলেই দক্ষতা বা সততা নিশ্চিত হয় না।'
তিনি আরও বলেন, 'বরং এতে অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই বেতন কাঠামোর চেয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।'
নিয়োগ ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে খসড়া নীতিমালায় দুই ধাপের নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রাথমিক সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন, কাগজপত্র যাচাই, সাক্ষাৎকার, নম্বর প্রদান এবং প্রাক-পরিচিতি যাচাই শেষে নিয়োগের সুপারিশ করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদনের মাধ্যমে নিয়োগ চূড়ান্ত হবে।
প্রকল্প পরিচালকদের কর্মদক্ষতা প্রতি ছয় মাস অন্তর মূল্যায়ন করা হবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে তাদের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো বা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
জবাবদিহিতা নিয়ে উদ্বেগ
দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের সংকটের কথা স্বীকার করলেও পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের কর্মকর্তারা বেসরকারি খাতের পেশাজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, কর্মরত সরকারি কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক কাঠামো ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থার মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বাইরের ব্যক্তি একই ধরনের সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকেন না।
সড়ক, রেল, নৌপথ, স্থানীয় সরকার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতের প্রকল্প অনুমোদনের দায়িত্ব ভৌত অবকাঠামো বিভাগের। এসব খাতে দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের সংকট সবচেয়ে বেশি বলে তারা উল্লেখ করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্য থেকেই প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ অব্যাহত রাখা উচিত।
চুক্তিভিত্তিক প্রকল্প পরিচালক দুর্নীতি বা আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পরে পালিয়ে গেলে বা দেশ ছেড়ে চলে গেলে তাদের কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
তারা চুক্তিতে আরও কঠোর বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। দুর্নীতি প্রমাণিত হলে প্রচলিত ফৌজদারি আইন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিধান রাখার সুপারিশ করেছেন।
মাসিক সর্বোচ্চ ৮ লাখ টাকা সম্মানী চালুর পরিবর্তে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের মূল বেতনের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত দায়িত্বভাতা দেওয়ার সুপারিশ করেছে বিভাগটি। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, বাজেটের মধ্যে এবং গুণগত মান বজায় রেখে প্রকল্প শেষ করতে পারলে প্রকল্প দলের জন্য কর্মদক্ষতাভিত্তিক আর্থিক প্রণোদনারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালকদের একটি শক্তিশালী পিডি পুল গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ।
রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের বিধানেও আপত্তি জানিয়েছে বিভাগটি। তাদের মতে, এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক চাপ ও তদবিরের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই নিয়োগ ও অপসারণের দায়িত্ব স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ও মূল্যায়ন কমিটির হাতে দেওয়ার সুপারিশ করেছে তারা। একই সঙ্গে অনৈতিক চাপের মুখে পড়া প্রকল্প পরিচালকদের জন্য 'হুইসেলব্লোয়ার প্রোটেকশন' এবং একটি সুস্পষ্ট 'এক্সিট পলিসি' রাখারও প্রস্তাব দিয়েছে।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বাইরে থেকেও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের সুযোগ উন্মুক্ত রাখলে মেধাবী ও দক্ষ পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আনুষ্ঠানিক যোগ্যতা পূরণ করলেও অনেক প্রার্থীর ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রম বা প্রশাসনিক কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা সীমিত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, 'আমাদের সরকারি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির কাঠামো অত্যন্ত জটিল। এসব নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা তাদের অনেকের জন্যই কঠিন হতে পারে। এটিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।'
তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে শত শত বা হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের নেতৃত্বে নিয়োগ দেওয়া হলে গুরুতর অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে প্রকল্প পরিচালনায় নিরপেক্ষতা দুর্বল হবে এবং ক্রয় কার্যক্রম ও পরামর্শক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
