আজ বা আগামীকাল পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একসময়ের মিত্র রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আজ শুক্রবার পদত্যাগ করবেন। বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে তিনটি সূত্র। রাষ্ট্রপতির পারিবারিক সূত্রও গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও অবগত করেছেন।
একটি সূত্র রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে, গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানান সাহাবুদ্দিন। আজ শুক্রবার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে।
তবে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় তিনটি সূত্রই নিজেদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এছাড়া বঙ্গভবন সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, তার পদত্যাগের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। আজ বিকেলে পদত্যাগ করবেন তিনি। তবে বিশেষ কোনো কারণে আজ না হলে এক দিন পিছিয়ে কাল শনিবার তিনি পদ ছাড়তে পারেন।
রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করে গুলশানে নিজ বাসায় উঠবেন। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা ও বিশ্রামের জন্য তার বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। গুলশানের বাসা এরই মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সম্ভাবনায় থাইল্যান্ডে ব্যক্তিগত সফর সংক্ষিপ্ত করে আজ শুক্রবার (২৪ জুলাই) দেশে ফিরেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তবে দেশে ফিরে স্পিকার জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে তার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে স্পিকার বলেন, 'আমি দেশের বাইরে ছিলাম। সুতরাং এখানে কে পদত্যাগ করবে, না করবে তা আমার জানা নেই। এখন হয়তো জানতে পারব। যদি তিনি পদত্যাগ করেন, তবে স্পিকারের কাছে করবেন। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন। এটাই সংসদীয় রীতি।'
নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফেরার বিষয়ে স্পিকার জানান, 'আমার কিছু ব্যক্তিগত কাজ আছে। যেহেতু গতকাল আমার মেডিকেল চেকআপ শেষ হয়েছে, তাই আমি আজই চলে এসেছি।'
এ সময় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, 'বাংলাদেশের সংবিধানে এটি লেখা আছে যে যখন রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেন, তখন স্পিকার "অ্যাক্টিং" বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে মূল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে জাতীয় সংসদ, যা তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়।'
২০২৪ সালের আগস্টে রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা হাসিনা যখন নয়াদিল্লিতে পালিয়ে যান, তখনই সাহাবুদ্দিনের পদটি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
২০২৩ সালে ৭৬ বছর বয়সি সাহাবুদ্দিন পাঁচ বছরের মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাকে মনোনয়ন দিয়েছিল হাসিনার দল, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ।
সম্প্রতি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফরের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন। রাষ্ট্রপতি গত ৯ মে লন্ডনে যান এবং ১৮ মে দেশে ফেরেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওই কথোপকথনের বিষয়ে জানতে পারে। এরপর রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, কথিত ওই ফোনালাপই রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের একমাত্র কারণ নয়। বিষয়টি 'আরও জটিল' বলে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, সম্প্রতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানানোর পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
গত ১০ জুলাই রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে ভারত থেকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন।
এদিকে, ধারণা করা হচ্ছে, দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা দলকে পুনর্গঠনের জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, এসব তৎপরতা কর্তৃপক্ষ কঠোর নজরদারিতে রেখেছে।
গত ১৭ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগের পরিকল্পনা করছেন। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন বলেও জানান।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, সরকার চাইলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকবেন। আর সরকার তার পদত্যাগ চাইলে তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াবেন।
