হামে মৃত্যু ৮০০ ছাড়াল, টিকাদানের ঘাটতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা
কয়েক মাস ধরে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি চললেও দেশে হামের প্রকোপে শিশু মৃত্যু থামছে না।
গত মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম আক্রান্ত হয়ে ৮০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এখনো প্রতিদিন গড়ে নতুন করে ৮০০-এর বেশি শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং চারজনের মৃত্যু হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কভারেজে বড় ঘাটতি, হার্ড ইমিউনিটি অর্জনে ব্যর্থতা এবং পর্যাপ্ত জনস্বাস্থ্য হস্তক্ষেপের অভাবে প্রাদুর্ভাব এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
গতকাল (২২ জুলাই) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম-সদৃশ উপসর্গে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫ মার্চ থেকে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হামে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮০৩ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুলাই পর্যন্ত মোট ৮০৩টি মৃত্যুর মধ্যে মে মাসে সর্বোচ্চ ৩০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দুটি জনগোষ্ঠী এখনো ব্যাপকভাবে সুরক্ষার বাইরে থাকায় হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, "আক্রান্তদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছয় মাসের কম বয়সী শিশু, যাদের টিকা দেওয়ার বয়স এখনো হয়নি। আবার পাঁচ বছরের বেশি বয়সীও অনেক শিশু আছে, যারা টিকা পায়নি। শুধু এই দুই গ্রুপই সংক্রমণ অব্যাহত রাখার জন্য যথেষ্ট।"
হাম ও রুবেলা নির্মূলবিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর আরও বলেন, সরকার টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সময় টিকা পাওয়ার উপযুক্ত শিশুর প্রকৃত সংখ্যা কম ধরেছিল। ৪০ লাখের বেশি শিশু টিকার বাইরে থাকায় হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
প্রাদুর্ভাবের পর সরকার গত ৫ এপ্রিল ধাপে ধাপে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। এ কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। কিন্তু গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। এ হিসেবে বোঝা যায়, প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে গিয়েছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভ্যাকসিনোলজিস্ট ডা. তাজুল ইসলাম এ. বারী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "৯৫ শতাংশ শিশুর মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হলে হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হবে না। আর হার্ড ইমিউনিটি না হলে সংক্রমণ চলতেই থাকবে।"
তিনি আরও বলেন, শুধু টিকাদানের কভারেজ বাড়ালেই হবে না, টিকার কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ জন্য নির্বাচিত কিছু এলাকায় বিভিন্ন বয়সী শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে তাদের শরীরে পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাই করা উচিত।
ডা. বারী বলেন, "বর্তমানে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ এই বয়সী শিশুদের জন্য নতুন করে কোনো টিকাদান কর্মসূচি নেই। আগে এমআর (মিজলস-রুবেলা) ক্যাম্পেইনের আওতায় ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।"
'বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে নতুন কৌশল ঠিক করতে হবে'
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠক করে নতুন কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তাদের সুরক্ষায় আইসোলেশন, হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার এবং হাসপাতাল ও পরিবারে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণসহ জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা (পাবলিক হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল মেজারস) জোরদার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, "কোথায় কোথায় টিকাদানে ঘাটতি রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে সেখানে আবার সম্পূরক টিকাদান কার্যক্রম (সাপ্লিমেন্টারি ইমিউনাইজেশন অ্যাকটিভিটিজ-এসআইএ) পরিচালনা করতে হবে।"
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, "হাসপাতালেও ট্রায়াজ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সংক্রামক রোগীদের আলাদাভাবে চিকিৎসা দেওয়া হতো। এখন তা হচ্ছে না। ফলে অন্য রোগ নিয়ে হাসপাতালে আসা শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে।"
ভ্যাকসিনেশনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল হয়েছিল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনের পর আমরা বুঝতে পারি, ভ্যাকসিনেশনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল হয়েছিল। তবে ২০ মে হাম টিকাদানের জাতীয় কর্মসূচি শেষ হলেও ২১ মে থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দিচ্ছেন।"
মন্ত্রী বলেন, "আমি যেসব হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি, সেখানে হামে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৯০ শতাংশই টিকা না পাওয়া।"
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, "অপুষ্টি হামে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। অপুষ্ট শিশুরা হামে আক্রান্ত হলে দ্রুত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। অনেক মায়েরও পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে এবং এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিংও ঠিকমতো হচ্ছে না। ফলে শিশুরা খুব দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।"
তিনি আরও বলেন, অনেক পরিবার শিশুকে চার-পাঁচ দিন বাসায় রেখে পরে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসে। এতে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
মন্ত্রী বলেন, "সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে টিকাদানের পাশাপাশি সরকার বাবল সিপ্যাপ ও ভেন্টিলেটরসহ নিবিড় চিকিৎসার ব্যবস্থা বাড়িয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বর দেখা দিলেই শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে আনার বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করা হচ্ছে।"
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশে হাম সন্দেহে ১ লাখ ৩ হাজার ৭৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়েছে ৯৯ হাজার ২৯৪ জন।
