দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির পরও হামে মৃত্যু অব্যাহত, টিকার ঘাটতি পূরণের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
প্রাদুর্ভাব শুরুর চার মাস পরও শিশুদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে হাম।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, টিকাদানের ঘাটতি পূরণ এবং কমিউনিটি পর্যায়ে চিকিৎসা জোরদার না করলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না।
তাদের মতে, শুধু টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা উন্নত করলেই মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের মতো উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহজনক মিলিয়ে হাম-সম্পর্কিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮০ জনে।
মোট মৃত্যুর মধ্যে ৬৮৫টি ছিল সন্দেহজনক হামের ঘটনা এবং ৯৫টি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হামের মৃত্যু।
একই সময়ে নতুন করে ৮৭৩ সন্দেহজনক হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এতে সারা দেশে মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ১১ জনে। এছাড়া, পরীক্ষাগারে আরও ১৪০টি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। ফলে মোট পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৪ হাজার ২৪৪।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে টিকাদানের ঘাটতি পূরণ এবং দ্রুত টিকার আওতা বাড়ানোর ওপর।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকার ঘাটতি পূরণ করা। যারা এখনো টিকা পায়নি কিংবা যাদের দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার সময় হয়েছে, তাদের দ্রুত টিকা দিতে হবে।'
তিনি বলেন, ১৫ বছরের কম বয়সী যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের যত দ্রুত সম্ভব টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে হামের টিকাও দেওয়া গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
ডা. মুশতাক আরও বলেন, শুধু টারশিয়ারি হাসপাতালে চিকিৎসা জোরদার করলেই মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, 'রোগী যখন সংকটাপন্ন অবস্থায় বড় হাসপাতালে পৌঁছায়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই অনেক দেরি হয়ে যায়। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এতে গুরুতর রোগীর সংখ্যা কমবে এবং মৃত্যুও কমানো সম্ভব হবে।'
হামের প্রাদুর্ভাবের পর সরকার এপ্রিল মাস থেকে ধাপে ধাপে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে।
২০ এপ্রিল থেকে কর্মসূচিটি সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হয় এবং ২০ মে তা শেষ হয়।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় নিয়মিত টিকাদানে শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।
তবে এই ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়।
ইপিআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের কভারেজ দাঁড়িয়েছে ১০৩ শতাংশ।
তবে ডা. মুশতাক বলেন, ২৮ জুন শুরু হওয়া জাতীয় ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইন এবং হামের টিকাদান কর্মসূচির মধ্যে একটি অসামঞ্জস্য রয়েছে। ভিটামিন 'এ' কর্মসূচিতে একই বয়সী প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখ শিশুর পার্থক্য রয়েছে। এটি ইঙ্গিত করে, আগের বছরের টিকাদানের ঘাটতি এখনো রয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় 'হার্ড ইমিউনিটি' [সমষ্টিগত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা] তৈরি হয়নি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনেক শিশুই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ নানা জটিলতায় ভুগছে। এসব জটিলতাও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়াচ্ছে।
তবে তিনি বলেন, আগের মাসগুলোর তুলনায় হামের প্রাদুর্ভাব এখন কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, 'আগের তুলনায় হামের প্রকোপ ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছে। রোগীর সংখ্যাও আগের চেয়ে কম। টিকাদান ও ভিটামিন এ কর্মসূচির প্রভাব ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হবে।'
ডা. মির্জা আশা প্রকাশ করেন, চলতি মাসের শেষ নাগাদ হামে মৃত্যুর সংখ্যা আরও কমবে। তবে এখন স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে ডেঙ্গু।
তিনি বলেন, 'বৃষ্টি হচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় পানি জমছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করা। হামের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আরও উন্নতি হবে। তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন থেকেই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।'
