বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন সাধারণ পরিষদে পাঠালো ইকোসক
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) শ্রেণি থেকে উত্তরণের আগে প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশ যে তিন বছরের অতিরিক্ত সময় চেয়েছে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করেছে।
২১ জুলাই অনুষ্ঠিত বৈঠকে ৫৪ সদস্যের সংস্থাটি সর্বসম্মতিক্রমে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব তিন বছর বাড়ানোর বাংলাদেশের আবেদন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী, আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। দেশের রাজনৈতিক পালাবদল এবং ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর আগে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএনসিডিপি)-কে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ইউএনসিডিপির সংকট মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মাথাপিছু আয়, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এবং মানবসম্পদ—এলডিসি থেকে উত্তরণের তিনটি মানদণ্ডই বাংলাদেশ এখনো পূরণ করছে। তবে সরকারপ্রধানের সময় বাড়ানোর আবেদন বিবেচনায় নিয়ে কমিটি ইকোসককে জানিয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ চাইলে প্রস্তুতি পর্ব স্বল্প সময়ের জন্য বাড়াতে পারে।
সুপারিশে ইউএনসিডিপি বলেছে, 'কমিটির অভিমত হলো, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে প্রস্তুতি পর্বের সময়সীমা বাড়ানো উপযুক্ত হবে।'
সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেনি ইকোসক
অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইউএনসিডিপির মূল্যায়ন পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সাধারণ পরিষদের কাছে নিজস্ব সুপারিশ দেওয়ার সুযোগ ছিল ইকোসকের। তবে ৫৪ সদস্যের সংস্থাটি নিজস্ব কোনো সুপারিশ না দিয়ে ইউএনসিডিপির প্রতিবেদনটি সরাসরি সাধারণ পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ কারণে কর্মকর্তাদের ধারণা, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি পর্ব স্বল্প সময়ের জন্য বাড়ানো হতে পারে। তাদের ভাষ্যমতে, এখানে 'স্বল্প সময়' বলতে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত তিন বছরের কম সময় বোঝানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ ইকোসকের কাছ থেকে আরও জোরালো সমর্থন আশা করেছিল। তাদের আশঙ্কা, ইকোসকের পক্ষ থেকে স্পষ্ট সুপারিশ না থাকায় বিষয়টি সাধারণ পরিষদে উঠলে কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্র প্রশ্ন তুলতে পারে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, 'ইকোসকের সামনে একটি বিকল্প ছিল সময় বাড়ানোর সুপারিশ করে তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা। কিন্তু ৫৪ সদস্যের সংস্থাটি তা করেনি। এতে বাংলাদেশ তিন বছরের সময়সীমা বাড়ানোর যে আশা করছে, তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।'
সময় চেয়েছে বাংলাদেশ ও নেপাল
বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওস—তিন দেশই চলতি বছর এলডিসি থেকে উত্তরণের তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশের আবেদনের পর নেপালও একই ধরনের আবেদন জমা দিয়েছে।
ইকোসকের বৈঠকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বাংলাদেশ ও নেপালের পক্ষে প্রস্তুতি পর্ব তিন বছর বাড়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এলডিসি থেকে টেকসই, সুশৃঙ্খল ও সহনশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রদূত জানান, সাধারণ পরিষদ সময় বাড়ানোর অনুমোদন দিলে বাংলাদেশ এ সময় প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ ও সংস্কার বাস্তবায়ন করবে এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতি আরও জোরদার করবে।
লাওস নির্ধারিত সময়েই উত্তরণে যাচ্ছে
বাংলাদেশ ও নেপালের বিপরীতে, স্থলবেষ্টিত দেশ লাওস অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়েই এলডিসি থেকে উত্তরণ করছে।
প্রায় ৮০ লাখ জনসংখ্যার দেশটির মাথাপিছু আয় ২,১৫০ মার্কিন ডলার। খনিজ সম্পদ, জলবিদ্যুৎ ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর একটি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
এছাড়া জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কাজে লাগিয়ে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও চীনে ব্যাপক পরিসরে বিদ্যুৎ রপ্তানি করছে লাওস। বর্তমানে বিদ্যুৎ রপ্তানি দেশটির অন্যতম প্রধান বৈদেশিক আয়ের উৎস।
