মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: তদন্তে ফ্লাইট নিরাপত্তা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের সুপারিশ; বাস্তবায়িত হয়নি কোনোটিই
গত বছর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সংঘটিত ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার পর সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটি ৩০টিরও বেশি সংস্কারের সুপারিশ করেছিল। এসব সুপারিশের মধ্যে ছিল কঠোর ভবন নির্মাণ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা, ঢাকা থেকে সামরিক বিমান প্রশিক্ষণ এলাকা সরিয়ে নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে বিমানবন্দরের 'অ্যাপ্রোচ জোন' থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দূরে স্থানান্তর। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তদন্ত কমিশন এই বিপর্যয়কে ঝুঁকিপূর্ণ নগর পরিকল্পনা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আইন অমান্য, দুর্বল তদারকি এবং নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষার সম্মিলিত ফল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দুর্ঘটনার অনেক আগে থেকেই সেখানে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
বিপর্যয় ও নেপথ্যের কারণ
২০২৫ সালের ২১ জুলাই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান দ্বিতীয় সার্কিটে প্রবেশের সময় উচ্চতা হারিয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে। ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও আগুনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামসহ ৩৫ জন নিহত হন।
সাবেক সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খানের নেতৃত্বে গঠিত ৯ সদস্যের তদন্ত কমিশন এবং তৎকালীন প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানের নেতৃত্বে কারিগরি কমিটি গত বছরের নভেম্বরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা ১৮৫ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ বৈমানিকের ভুল হলেও ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতার জন্য সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ (বেবিচক), রাজউক এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা দায়ী।
বিপজ্জনক ভবন ও অব্যবস্থাপনা
তদন্তে স্কুলের অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দুর্ঘটনার সময় তিন তলা ভবনটিতে শত শত শিক্ষার্থী ক্লাস করছিল, কিন্তু জরুরি নির্গমনের জন্য মাত্র একটি সিঁড়ি ছিল। ফায়ার সার্ভিসের মতে, এমন ভবনে কমপক্ষে তিনটি জরুরি বহির্গমন পথ থাকা বাধ্যতামূলক। পর্যাপ্ত পথ থাকলে প্রাণহানি কমানো যেত বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, ক্যাম্পাসের ১৭টি ভবনের মধ্যে মাত্র সাতটির বৈধ অনুমোদন রয়েছে। বাকি ভবনগুলো হয় অনুমোদনহীন অথবা বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদনের কথা বললেও কোনো দালিলিক প্রমাণ দিতে পারেনি। রাজউক এসব অনিয়ম জেনেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন ভবনের আবেদন নিয়ে প্রশ্ন
টিবিএস-এর প্রাপ্ত নথি অনুসারে, চলতি বছরের ৬ জুলাই মাইলস্টোন কলেজের অধ্যক্ষ জিয়াউল আলম দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসে একটি নতুন সাততলা ভবন নির্মাণের অনুমতি চেয়ে রাজউকের উত্তরা কার্যালয়ে আবেদন করেন। যোগাযোগ করা হলে জিয়াউল আলম দাবি করেন যে তারা প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন নিয়েই আবেদন করেছেন। তবে বিস্তারিত লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিন দিনেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
সরেজমিনে ওই ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম চলছে। মাত্র এক বছর আগে যে এখানে দেশের অন্যতম ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তার কোনো ছাপ সেখানে নেই। মাইলস্টোনের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নূরুন্নবী নতুন আবেদনের বিষয়টি অস্বীকার করলেও রাজউক কর্মকর্তারা আবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রাজউকের উত্তরা কার্যালয়ের অথরাইজড অফিসার এম এম এহসানুল ইমাম বলেন, 'বিমানবন্দরের কাছে যেকোনো ভবনের জন্য বেবিচকের অনুমোদন থাকা বাধ্যতামূলক। সর্বশেষ আবেদনে বেবিচকের ক্লিয়ারেন্স নেই। আমরা নথিগুলো যাচাই করছি।'
উপেক্ষিত বিমানবন্দর নিরাপত্তা বিধি
দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসটি বিমানবন্দরের 'অবস্ট্যাকল লিমিটেশন সারফেস'-এর মধ্যে অবস্থিত, যা বিমান চলাচলের জন্য একটি সংরক্ষিত আকাশসীমা। বেবিচক বিধিমালা অনুযায়ী এই এলাকায় ভবনের উচ্চতা ও ভূমি ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। মাইলস্টোন স্কুলটি বিমানবন্দরের 'ইনার হরিজন্টাল সারফেস' এবং 'ইনার অ্যাপ্রোচ' এলাকার মধ্যে পড়েছে, যেখানে ভবনের উচ্চতা কোনোভাবেই ১৫০ ফুটের বেশি হতে পারবে না।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিলুর রহমান খান বলেন, 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুনরায় নির্মাণের অনুমতি দেওয়া তদন্ত কমিশনের সুপারিশের পরিপন্থী। এমন দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে সক্রিয় হলেও পরে সব থমকে যায়।' প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বেবিচক উচ্চতা সীমা লঙ্ঘনকারী ৬৩০টি ভবন সম্পর্কে রাজউককে জানালেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অবাস্তবায়িত সুপারিশের পাহাড়
কমিশন সুদূরপ্রসারী সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল দীর্ঘমেয়াদে স্কুল-হাসপাতালের মতো ঘনবসতিপূর্ণ স্থাপনা বিমানবন্দর এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন কোনো স্থাপনা নিষিদ্ধ করা। এছাড়া রাজউক ও বেবিচকের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং ঢাকার বাইরে জনবসতিহীন এলাকায় একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছিল। কারিগরি কমিটি ঢাকার ওপর একক ফাইটার জেট প্রশিক্ষণ বন্ধ এবং সামরিক বিমান ঘাঁটি জনাকীর্ণ এলাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল।
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় পরিবারগুলো
দুর্ঘটনার পর সরকার নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ এবং আহতদের ৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিলেও অনেক পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করে। তদন্ত কমিশন প্রতিটি মৃত শিশুর জন্য ১ কোটি টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৮০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণসহ আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য আরও বড় অংকের সহায়তার সুপারিশ করেছে।
কমিশনের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারগুলো সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। দুর্ঘটনায় নিহত সপ্তম শ্রেণির ছাত্র জাবির ফারহানের বাবা হাবিবুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'শুনেছি মাইলস্টোন আরও ভবন তুলছে। প্রশাসন কেন এটি বন্ধ করছে না? আরেকটি ট্র্যাজেডি ঘটার আগেই এই এলাকা থেকে স্কুলটি সরিয়ে নেওয়া উচিত।'
