২০২২ সালের বিশ্বকাপ সম্প্রচারে লুটপাট হয়েছে, এবার ঘাটতি মাত্র ৪-৫ কোটি টাকা: তথ্যমন্ত্রী
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচারের নামে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
তিনি দাবি করেন, এবার সরকার সরাসরি ফিফার কাছ থেকে সম্প্রচার স্বত্ব কিনে সাব-লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে প্রায় পুরো ব্যয়ই ওঠতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বিশ্বকাপ সম্প্রচারে সরকারের ঘাটতি রয়েছে মাত্র ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা।
রোববার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী।
মন্ত্রী জানান, সরকার ফিফার কাছ থেকে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের মিডিয়া রাইটস সরাসরি ৩ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলারে কিনেছে। পরে দেশের চারটি প্রতিষ্ঠানের কাছে সাব-লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে এর অধিকাংশ অর্থ আদায় করা হয়েছে। বাকি ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার ঘাটতিও রাজস্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টা চলছে।
২০২২ সালের বিশ্বকাপ সম্প্রচারের ব্যয়ের সঙ্গে এবারের ব্যবস্থার তুলনা করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, "সে সময় ফিফার কাছ থেকে একটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল। পরে বাংলাদেশের তমা কনস্ট্রাকশন সেই স্বত্ব বিটিভির কাছে ৯৮ কোটি টাকায় বিক্রি করে। একই সঙ্গে স্যাটেলাইট সম্প্রচার স্বত্ব ২২ কোটি টাকা এবং ডিজিটাল সম্প্রচার স্বত্ব ১৭ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল।"
তার দাবি, "ফিফা পেয়েছিল মাত্র ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। বাকি অর্থ মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে গেছে। জনগণের করের ৯৮ কোটি টাকা ব্যয় করে সরকার ওই সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল, যা বিশ্বকাপ সম্প্রচারের নামে দুর্নীতির একটি উদাহরণ।"
মন্ত্রী বলেন, "২০২২ সালের বিশ্বকাপ সম্প্রচার এবং ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সম্প্রচারের ব্যয়ের তুলনা করলেই বোঝা যাবে, আগের সরকারের সময়ে কীভাবে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় হয়েছে। বর্তমান সরকার সরাসরি ফিফার কাছ থেকে স্বত্ব কিনে তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিশ্চিত করেছে।"
তিনি আরও বলেন, "২০২২ সালের এই তুলনাটা সামনে আনলেই বোঝা যাবে শেখ হাসিনার আমলে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের নামে কীভাবে দুর্নীতি হয়েছে, কীভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট হয়েছে এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হয়েছে।"
সংবাদ সম্মেলনে বিটিভির মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম বলেন, বিটিভির ইতিহাসে এবারই প্রথম তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিশ্বকাপ সম্প্রচার সম্ভব হয়েছে। রাজস্ব ভাগাভাগির কিছু বিষয় এখনও বাকি রয়েছে। সেগুলো সম্পন্ন হলে সরকারের আর কোনো ঘাটতি থাকবে না বলে আশা করা হচ্ছে।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশ ছিল দেশের মানুষকে বিশ্বকাপের খেলা দেখাতে হবে, তবে রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো যাবে না। সে লক্ষ্যেই ফিফার সঙ্গে সরাসরি দরকষাকষি করে সম্প্রচার স্বত্ব কেনা হয়েছে।
তিনি জানান, "বিটিভি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এবং ক্রীড়া সাংবাদিকদের সহযোগিতায় পুরো প্রক্রিয়া সফল হয়েছে। ভবিষ্যতেও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে আরও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনকভাবে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।"
মন্ত্রী বলেন, বিশ্বকাপ চলাকালে বিটিভির নিয়মিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার না হওয়ায় যে সম্প্রচার সময় ব্যয় হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য বিবেচনায় নিলে পুরো আয়োজন লাভজনক অবস্থানে চলে যাবে। একই সঙ্গে বিটিভির প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীরা সফলভাবে সম্প্রচার পরিচালনা করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব শাহ আলম জানান, "বিশ্বকাপ সম্প্রচারের সময় বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিংয়ের চেষ্টা হয়েছিল। তবে বিটিভি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা তা সফলভাবে প্রতিরোধ করেছেন। ফলে বৈধভাবে সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোই সম্প্রচার করতে পেরেছে।"
২০২২ সালের বিশ্বকাপ সম্প্রচারে অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। সরকার আইনি প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
বিটিভির মহাপরিচালক জানান, এ বিষয়ে বিটিভির অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)ও একটি প্রাথমিক তদন্ত করছে বলে তিনি জানেন।
পরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, "বিভাগীয় তদন্তও চলছে। তদন্ত শেষ হলে প্রয়োজন হলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বা বিটিভির পক্ষ থেকে দুদকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।"
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলকে বাংলাদেশে এনে প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এটি ভালো প্রস্তাব। বিষয়টি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে।
খেলোয়াড় তৈরিতে সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, ক্রীড়াকে পেশাদার পর্যায়ে উন্নীত করতে সরকার কাজ করছে। প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের ছোটবেলা থেকেই চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে কৃতী ক্রীড়াবিদদের সম্মাননা এবং স্পোর্টস কার্ড চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিটিভির ভূমিকা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, "জনমত গঠন এবং ইতিবাচক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের বিষয়গুলোতে বিটিভিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হবে।"
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
