বিশ্বকাপ ফাইনালে ২৪ জন খেলোয়াড়ই লা লিগার—এই সাফল্যের রহস্য কী?
এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালে যখন স্পেন ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তখন কোনো ঘরোয়া লিগ যদি সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্ব করে থাকে, তবে সেটি স্পেনের লা লিগা। স্পেনের শীর্ষ এই লিগের মোট ২৪ জন খেলোয়াড় ফাইনালে লড়ছেন, যাদের মধ্যে ১৮ জন স্পেনের এবং ৬ জন আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সদস্য। লা লিগার সভাপতি হ্যাভিয়ের তেবাসের মতে, এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়।
'দ্য অ্যাথলেটিক'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেবাস বলেন, 'আমি বিশ্বাস করি আমাদের (স্পেন) ফুটবল পিরামিড বিশ্বের সেরা।' তার মতে, এই সংখ্যাগুলো কোনো একটি টুর্নামেন্টের বিচ্ছিন্ন সাফল্য নয়, বরং বড় কোনো অর্জনেরই প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, 'তারা লা লিগায় খেলুক বা অন্য কোথাও, তারা সবাই আমাদের ফুটবল পিরামিডের ভেতরেই তৈরি হয়েছে। এটি এমন সব খেলোয়াড় তৈরি করে যাদের প্রযুক্তিগত মান, প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব এবং শারীরিক প্রস্তুতি বিশ্বমানের।'
স্পেনের ফাইনাল পর্যন্ত যাত্রার মূলে রয়েছে তাদের ঘরোয়া একাডেমি থেকে উঠে আসা প্রতিভারা। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনাও লা লিগার এই মেধা অন্বেষণ প্রক্রিয়ার সুবিধা পেয়েছে। স্প্যানিশ ক্লাবগুলো কয়েক দশক ধরে আর্জেন্টাইন প্রতিভা শনাক্ত ও তৈরি করছে, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ লিওনেল মেসি। তিনি মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত 'লা মাসিয়া' একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন।
তেবাসের দাবি, এই সাফল্যের কৃতিত্ব কেবল বার্সেলোনার লা মাসিয়া বা রিয়াল মাদ্রিদের 'লা ফাব্রিকা'র মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে দেশব্যাপী একাডেমিগুলোর একটি বিশাল নেটওয়ার্ক, কোচিং শিক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক পথ, যা তরুণ খেলোয়াড়দের বিদেশ যাওয়ার পরিবর্তে দেশেই থাকতে উৎসাহিত করে।
তেবাস বলেন, 'আমাদের ক্লাবগুলো, এমনকি অনেক অপেশাদার ক্লাবও একাডেমি, সুযোগ-সুবিধা এবং খেলোয়াড়দের শিক্ষার পেছনে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। তরুণরা স্প্যানিশ ফুটবলে থেকেই নিজেদের গড়ে তুলতে চায়। এটি একটি বড় ফ্যাক্টর।'
লা লিগার কঠোর আর্থিক নিয়ন্ত্রণকেও এই সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তেবাস। তার মতে, প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো যেমন ব্যাপক লোকসান সত্ত্বেও ট্রান্সফার মার্কেটে বড় খরচ করে, লা লিগার 'ফাইন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে' নিয়ম ক্লাবগুলোকে কেবল খেলোয়াড় কেনার পরিবর্তে প্রতিভা তৈরিতে বাধ্য করে। তিনি বলেন, 'ক্লাবগুলো জানে যে তারা টাকা নষ্ট করে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। তাই তারা তাদের একাডেমিতে জোর দেয়, কারণ তারা জানে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার এটাই একমাত্র পথ।'
এই দর্শন এখন নারী ফুটবলেও ছড়িয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তেবাস বলেন, বার্সেলোনার মতো ক্লাব বা স্পেনের নারী জাতীয় দলের বিশ্বশক্তিতে রূপান্তর ধারাবাহিক পরিশ্রমেরই ফল।
লামিন ইয়ামাল, পাউ কুবারসি কিংবা দানি অলমোর মতো তারকাদের জন্ম দেওয়া এই ফুটবল ইকোসিস্টেম ২০৩০ সালে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর যৌথ আয়োজনে সেই বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে, তবে স্পেনে হবে অধিকাংশ ম্যাচ এবং সেখানেই দলগুলোর প্রধান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকবে।
তেবাস বিশ্বাস করেন, এই টুর্নামেন্ট কেবল সেরা ফুটবলার তৈরির দক্ষতাই নয়, বরং স্পেনের ক্লাব কাঠামোর বিবর্তনকেও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবে। এই রূপান্তরের পেছনে ২০২১ সালে 'সিভিসি ক্যাপিটাল পার্টনার্স'-এর সঙ্গে হওয়া বিতর্কিত চুক্তিটির বড় ভূমিকা রয়েছে। চুক্তির অধীনে স্প্যানিশ ক্লাবগুলো প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার (২ বিলিয়ন ইউরো) তহবিল পেয়েছে। বিনিময়ে আগামী ৫০ বছর লা লিগার অডিওভিজ্যুয়াল আয়ের আনুমানিক ৮.২৫ শতাংশ অংশীদার হবে সিভিসি। উল্লেখ্য, রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা এই চুক্তিতে অংশ নেয়নি।
এই তহবিলের শর্ত ছিল, প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থ অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে, খেলোয়াড় কেনায় নয়। তেবাস বলেন, সিভিসি তহবিলের কারণেই স্পেনের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে জনগণের ট্যাক্সের টাকার পরিবর্তে বেসরকারি পুঁজি ব্যবহৃত হচ্ছে। ভ্যালেন্সিয়ার নতুন স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে সেল্টা ভিগো, জারাগোজা ও সেভিয়ার সংস্কারকাজ সিভিসি-র অর্থায়নে ত্বরান্বিত হয়েছে।
তেবাস বলেন, 'আমার মনে আছে স্প্যানিশ সরকার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল স্টেডিয়াম সংস্কারে কত জনস্বাস্থ্যের টাকা লাগবে। আমি তাদের বলেছিলাম—এক টাকাও না। সেই টাকা রাস্তা, হাসপাতাল এবং স্কুলে যাওয়া উচিত।'
তিনি আরও যোগ করেন, লা লিগার কেন্দ্রীয় প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপনায় বড় ভূমিকা পালন করবে। টিকিট বুকিং, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল থেকে শুরু করে লাইটিং ও অডিওভিজ্যুয়াল সিস্টেম—সবই লা লিগার সাবসিডিয়ারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সমন্বিত হবে।
২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল স্পেনে হওয়া উচিত বলে মনে করেন তেবাস। তিনি বলেন, 'শুরু থেকেই কথা ছিল ফাইনাল স্পেনে হবে। আমাদেরই ফাইনাল আয়োজন করা উচিত।'
সাক্ষাৎকারে ফিফা এবং এর প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন তেবাস। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে এবং ২০৩০ আসরে দল সংখ্যা বাড়িয়ে ৬৪ করার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তেবাস মনে করেন, দল সংখ্যা বাড়ানো মানেই ভালো কিছু নয়।
তিনি বলেন, ফিফার এই দল সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘরোয়া লিগগুলোর অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা বাড়লে ঘরোয়া লিগের সূচি কমে যায়, যা সম্প্রচার স্বত্ব, টিকিট বিক্রি এবং বাণিজ্যিক আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তেবাস কঠোর ভাষায় বলেন, 'ফিফা ও কনমেবলের এই কর্তারা ঘরোয়া লিগগুলোকে ধ্বংস করছে। এটা অবিশ্বাস্য যে তারা তাদের সিদ্ধান্তের পরিণতি নিয়ে ভাবেন না। আমি সবসময় বলি, এই জ্যেষ্ঠ ফুটবল কর্মকর্তাদের অধিকাংশেরই ফুটবল ক্লাব চালানোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই।'
