সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনে গুরুত্ব পেয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সাংবিধানিক বিতর্ক
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন গত ১৫ জুলাই সমাপ্ত হয়েছে। ৩৯ দিনের দীর্ঘ এই অধিবেশনটি মূলত রাজনৈতিক উত্তেজনা, সাংবিধানিক বিতর্ক এবং নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার নানা সংকট নিয়ে সংসদ সদস্যদের তীব্র বাদানুবাদের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে, যার ফলে মূল বাজেট আলোচনা অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়।
গত ৭ জুন শুরু হওয়া সংসদের দ্বিতীয় এই অধিবেশনটিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড বাজেট পাস করা হয়েছে। তবে বাজেট বক্তৃতায় জাতীয় আর্থিক নীতির চেয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি ইতিহাস-আখ্যান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ সংকট, শিক্ষা ও স্থানীয় উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এই ২৬ কার্যদিবসে আইন পাস, প্রশ্নোত্তর পর্ব, সংসদীয় কমিটি গঠন এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো নিয়মিত সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
গত ১১ জুন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন। বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
বাজেটের ওপর টানা ১৪ কার্যদিবস আলোচনা হয়, যেখানে ৩১৬ জন সংসদ সদস্য মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট বক্তব্য দেন। গত ৩০ জুন সংসদ কণ্ঠভোটে এই রেকর্ড বাজেট পাস করে। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা একে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের রোডম্যাপ হিসেবে বর্ণনা করলেও, বিরোধী দল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট ঘাটতি মেটানোর ক্ষেত্রে এর তীব্র সমালোচনা করে।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে সংসদে উত্তাপ
চলতি অধিবেশনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিরোধ ছিল সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে।
গত ১৪ জুন সংসদ একটি ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করে, যেখানে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে গঠিত এই কমিটিকে জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধনের খসড়া তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সরকার পক্ষ দাবি করে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের একমাত্র সাংবিধানিক পথ হলো সংসদীয় সংশোধন। অন্যদিকে বিরোধী দল একটি স্বাধীন 'সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল' গঠনের দাবি জানিয়ে বলে, ভোটাররা সংবিধানে আংশিক সংশোধনীর পরিবর্তে একটি মৌলিক ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এ নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে বিরোধীদলীয় এমপিরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন এবং তাদের অংশগ্রহণ ছাড়াই কমিটি গঠিত হয়।
সংসদে স্থানীয় ইস্যু নিয়ে বিতর্ক
যদিও অধিবেশনটি ছিল বাজেট কেন্দ্রিক, তবুও এমপিরা তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার সমস্যাগুলো জোরেসোরে তুলে ধরেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল বিদ্যুৎ সংকট। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা দাবি করেন, দেশের গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলে স্পিকার উভয় পক্ষকে যাচাইকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কথা বলার আহ্বান জানান।
এছাড়াও প্রাত্যহিক সংসদীয় কার্যক্রমে সদস্যরা রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ ও স্থানীয় অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে কথা বলেন, যা জাতীয় অর্থনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি স্থানীয় সমস্যাগুলোকে সংসদে অগ্রভাগে নিয়ে আসে।
রাজনৈতিক বিতর্ক ও অন্যান্য বিষয়
মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই অভ্যুত্থান এবং এর ঐতিহাসিক আখ্যান নিয়ে আলোচনা একাধিকবার সংসদকে উত্তপ্ত করে তোলে। ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের করা একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়, যার ফলে স্পিকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং কিছু আপত্তিকর মন্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী (রেকর্ড) থেকে এক্সপাঞ্জ (বাদ দেওয়া) করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সরকারি মোবাইল অপারেটর টেলিটক নিয়েও সংসদে আলোচনা হয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সরকারের টেলিটক বিক্রি করার কোনো পরিকল্পনা নেই, বরং তারা এটিকে আধুনিকায়নের চেষ্টা করছেন। বিরোধী দলের এমপিরা অবশ্য টেলিটকের ক্রমাগত লোকসান ও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।
শিক্ষা ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আনম এহসানুল হক মিলন ঘোষণা করেন, যারা কোনো কারণে চলমান এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারেনি তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ভুল প্রশ্ন থাকার কারণে ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও সার্বিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে।
এদিকে, 'ধর্ষণ মামলা বৃদ্ধি মানেই অপরাধ বৃদ্ধি নয়'—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন একটি মন্তব্য নিয়েও সংসদে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
পুরো অধিবেশন জুড়েই স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার সংসদ সদস্যদের সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখার আহ্বান জানান। বেশ কিছু ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অসংবিধানিক মন্তব্য রেকর্ড থেকে বাদ বা এক্সপাঞ্জ করা হয়। আলোচনায় মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি, লিখিত বক্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং সম্পূরক প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দেওয়ার জন্য স্পিকার ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও, এই অধিবেশনে ১০টি সরকারি বিল পাস করা হয়েছে। সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় ২৫ জন এমপি অংশ নেন।
এমপিরা কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধির আওতায় ৭১৫টি নোটিশ জমা দেন, যার মধ্যে ২৪টি গৃহীত হয় এবং ২২টির ওপর আলোচনা হয়। এছাড়া ৭১এ বিধির আওতায় ১২৫টি দুই মিনিটের নোটিশ পাওয়া গেছে এবং ১৩১ বিধির আওতায় চারটি মূল প্রস্তাব নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া ২৭৮টি প্রশ্নের মধ্যে ৩৫টির উত্তর দেওয়া হয়েছে এবং এমপিদের জমা দেওয়া ৫,০৩১টি প্রশ্নের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ৩,৪৭৪টির উত্তর দিয়েছে। এছাড়া সংসদ এই অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন কমিটিসহ মোট ১১টি স্থায়ী কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করেছে।
সব মিলিয়ে, সংসদ সরকারের রেকর্ড বাজেট পাস এবং আইনি এজেন্ডা সম্পন্ন করলেও, অর্থনৈতিক নীতির চেয়ে এই অধিবেশনটি মূলত রাজনৈতিক সংঘাত, সাংবিধানিক বিরোধ, স্থানীয় সমস্যা এবং সংসদীয় আচরণ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জন্যই বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
