সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে হান্নান মাসউদের মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক, এক্সপাঞ্জ করার দাবি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদের সমালোচনামূলক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সময় আজ রোববার (২১ জুন) এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১১তম বৈঠকে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ভাষণে বিরোধী দলের আন্দোলনের সমালোচনা করতে গিয়ে অসত্য বা ভুল তথ্য ব্যবহার করেছেন। এ বক্তব্যের পর সরকারি দলের সদস্যরা সংসদ নেতাকে নিয়ে করা মন্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার (এক্সপাঞ্জ) দাবি জানান। অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা জানান, জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ নেতার সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।
বাজেটের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে হান্নান মাসুদ বলেন, "২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বর্তমান সরকারের একটি 'আকাঙ্ক্ষার দলিল', কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত কোনো পরিকল্পনা নয়। বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে না।"
সংসদ নেতার সমালোচনা করে হান্নান বলেন, "প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ভাষণে অসত্য তথ্য দিয়ে বিরোধী দলের আন্দোলনের সমালোচনা করেন এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ঋণ নেওয়াকে উৎসাহিত করেন, যা অত্যন্ত আশাহত করার মতো।"
বক্তব্যে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার 'নামকরণের রাজনীতির' তুলনা টেনে বলেন, "২০২৪ সালের পর দেশে এক ধরনের 'খ্যাতির বিড়ম্বনা' দেখা যাচ্ছে। অতীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, যেখানে সবকিছুর নাম তার নামে রাখা হতো। বর্তমানে একজন প্রতিমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, যেখানে তার অজান্তেই ১০ থেকে ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়নের নাম তার পরিবারের নামে রাখা হচ্ছে।"
সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, 'ফ্যাসিস্ট' আমলের মতো বর্তমান সংসদের কিছু মন্ত্রীও একই ধরনের ভাষায় কথা বলছেন। তিনি বলেন, "স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সব সীমান্ত হত্যাকে সীমান্ত হত্যা বলা যাবে না। এটি দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।" এ ছাড়া তিনি মব সংস্কৃতি, শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও ডাকাতির ঘটনা উল্লেখ করে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করেন এবং দাবি করেন, বাজেট ঘোষণার পরদিনই চাল ও ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে গেছে।
হান্নান মাসুদের বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, "সংসদে কোনো অসত্য বক্তব্য বা কারও সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে—এমন মন্তব্য না করার বিষয়ে একটি সমঝোতা ছিল। 'জুলাই আন্দোলনের' নেতা এবং নোয়াখালীর এই সংসদ সদস্য সংসদ নেতাকে নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন তাতে আমরা গভীরভাবে ক্ষুব্ধ।" তিনি সংসদ নেতাকে নিয়ে করা 'অসত্য মন্তব্যগুলো' সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে অনুরোধ জানান।
এর জবাবে বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, "কোনো বক্তব্যকে অসত্য বললে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হবে কোন অংশটি ভুল। সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য সংসদ নেতার বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই নিজের মতামত তুলে ধরেছেন। বিরোধী দলের সংসদ নেতার সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও একজন মানুষ, তার ভুল বা 'স্লিপ অব টাং' হতে পারে।" তিনি আরও বলেন, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য এবং কোনো ধরনের কর্তৃত্ববাদে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা তাদের নেই।
পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, "হান্নান মাসুদ স্পষ্টভাবে সংসদ নেতা সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা একদিকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, অন্যদিকে নিজেরাই একই ধরনের আচরণ করছেন।" তিনি সংসদের মর্যাদা রক্ষায় বিতর্কিত অংশটি এক্সপাঞ্জ করার আহ্বান জানান।
বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠলে অধিবেশন কক্ষে হট্টগোল শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডেপুটি স্পিকার হান্নান মাসুদকে আসনে বসার নির্দেশ দেন এবং সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, "সংসদ শাহবাগ চত্বর নয়; এখানে সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।"
স্পিকারের মন্তব্যের পর বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বলেন, "সংসদের নিজস্ব রীতি ও বিধান রয়েছে। বাইরের রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব বাইরে দেওয়া উচিত এবং সংসদীয় জবাব সংসদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। সংসদের ভেতরে সত্য-মিথ্যা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়া সবার জন্য বিব্রতকর হতে পারে। কারও মর্যাদা ক্ষুণ্ন না করে বিতর্কিত বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়াই সবার জন্য ভালো হবে।"
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর ডেপুটি স্পিকার জানান, সংসদীয় বিধি-বিধান ও রীতিনীতি অনুযায়ী বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরপর অধিবেশনের কার্যক্রম পরবর্তী কার্যসূচি অনুযায়ী এগিয়ে যায়।
