ভাঙছে বিমানের একচেটিয়া আধিপত্য, তৃতীয় টার্মিনালে সেবা দিতে নিয়োগ পাবে বৈশ্বিক জায়ান্টরা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রীসেবা দিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি দ্বিতীয় আরেকটি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। দেশের অন্যতম লাভজনক এই এভিয়েশন ব্যবসায় প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্তকে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনাল থেকে চলাচলকারী এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রী-সংক্রান্ত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার জন্য বিমান অথবা অন্য একটি অপারেটরকে বেছে নিতে পারবে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের কাজ এককভাবে বিমানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা জানান, গত ৩-৪ জুন বেবিচক ও তৃতীয় টার্মিনালের সামগ্রিক পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
'যাত্রীসেবার জন্য দ্বিতীয় একটি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগ করা হবে। তবে নতুন টার্মিনালের কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের বিষয়টি এককভাবে বিমানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে,' বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক টিবিএসকে বলেন।
এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে টার্মিনালটির যাত্রী ও কার্গো—উভয় সেবার জন্যই দ্বিতীয় অপারেটর নিয়োগ করা হবে বলে আগে যে ধারণা করা হচ্ছিল, তা থেকে সরে আসা হলো। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার মান ও দক্ষতার অভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সমালোচনার মুখে পড়ছে বিমান।
বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করতে ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের মেঞ্জিস অ্যাভিয়েশন, তুরস্কের চেলেবি অ্যাভিয়েশন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডনাটা, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্টসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
গত কয়েক মাসে কূটনীতিক ও কোম্পানির প্রতিনিধিরা লবিং তৎপরতা জোরদার করেছেন। নিজ নিজ দেশের কোম্পানিগুলোর পক্ষে কথা বলতে সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রদূতরা বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। চলতি মাসের শুরুর দিকে বিমান চলাচলমন্ত্রী লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে মেঞ্জিস অ্যাভিয়েশনের কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শনে যান।
সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে জাপানি কনসোর্টিয়াম
বেবিচক সূত্র জানায়, সম্ভাব্য দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলারদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে জাপানি কনসোর্টিয়াম। সেখান থেকে চূড়ান্ত বাছাই করবে বাংলাদেশ।
নাম না প্রকাশের শর্তে বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, 'জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী একাধিক কার্গো হ্যান্ডলার রাখার সুযোগ নেই।'
তিনি কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যমান কার্গো টার্মিনালের সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ করা হলে ভবিষ্যতে দ্বিতীয় কার্গো হ্যান্ডলার নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'জাপানি পক্ষ সম্ভাব্য অপারেটরদের সংক্ষিপ্ত তালিকা দেবে। এরপর সংশ্লিষ্ট তাদের যোগ্যতা, লাইসেন্স, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা মূল্যায়ন করে কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।'
জাতীয় নিরাপত্তা ও পরিচালনার মান পর্যালোচনা করা হবে
বেবিচক ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে মতবিরোধের কারণে তৃতীয় টার্মিনাল প্রায় ১৮ মাস ধরে অলস পড়ে আছে। এই কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো কর্পোরেশন, নিপ্পন কোয়েই ও নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশন।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক দফা আলোচনার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।
কনসোর্টিয়াম-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, 'সম্ভাব্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলারদের তালিকা থেকে বেবিচক মূলত দুটি বিষয় খতিয়ে দেখবে: জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে কোম্পানিটি গ্রহণযোগ্য কি না, আর তাদের পরিচালনার মান কেমন।'
চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত বলেছিলেন, এ বছরের ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি সই হতে পারে। এছাড়া আগামী ১৬ ডিসেম্বর অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে টার্মিনালটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে বিমানের লাভজনক ব্যবসা
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রধানত যাত্রী ও কার্গো সেবা—এই দুই ভাগে বিভক্ত। যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ের মধ্যে রয়েছে বোর্ডিং, ব্যাগেজ ও উড়োজাহাজের সহায়তামূলক কার্যক্রম।
ঢাকা বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগীব সামাদ টিবিএসকে বলেন, মোট কাজের প্রায় ৭৫ শতাংশই যাত্রীকেন্দ্রিক, বাকি ২৫ শতাংশ কার্গো-সংক্রান্ত।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিমানের অন্যতম লাভজনক খাত। এখান থেকে তাদের বছরে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আয় হয়। এয়ারলাইন্সগুলো প্রতিটি ফ্লাইটের জন্য বিমানকে ২ হাজার ২০০ থেকে ৬ হাজার ডলার ও কার্গোর ক্ষেত্রে কেজিতে ০.০৭ ডলার দেয়।
তা সত্ত্বেও সেবার মান নিয়ে বিমানকে ক্রমাগত সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। সেবার মান উন্নত করতে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় একটি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছিল।
৩৮টি বিদেশি এয়ারলাইন্সের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এয়ারলাইন্স অপারেটরস কমিটি ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি উত্থাপন করে।
তাদের এই দাবি এখন আংশিকভাবে পূরণ হতে চলেছে। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের একক নিয়ন্ত্রণ বিমানের হাতেই থাকছে, তবে যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে এয়ারলাইন্সগুলো নিজেদের পছন্দমতো অপারেটর বেছে নিতে পারবে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এত আগ্রহী কেন
ঢাকা বিমানবন্দর বর্তমানে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী ও ২ লাখ ৫০ হাজার টন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে সক্ষম।
৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের তৃতীয় টার্মিনাল এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যা বছরে আরও ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী এবং প্রায় ৫ লাখ টন পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের বাড়তি সক্ষমতা যোগ করবে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রমাগত যাত্রীসংখ্যা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক অপারেটরদের কাছে এদেশের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবসা দিন দিন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
বিমানবন্দরের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে যেখানে যাত্রীসংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ও ২০২৪ সালে ১ কোটি ২৫ লাখ, সেখানে ২০২৫ সালে ঢাকা বিমানবন্দর ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার যাত্রী হ্যান্ডল করেছে। মোট যাত্রীর মধ্যে ১ কোটি ৩ লাখ ১২ হাজার ছিলেন আন্তর্জাতিক রুটের এবং ২৪ লাখ ১১ হাজার ছিলেন অভ্যন্তরীণ রুটের।
বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) প্রক্ষেপণ অনুসারে, আগামী এক দশকের মধ্যে ঢাকার যাত্রী চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'বিশ্বের অধিকাংশ দেশে একাধিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এজেন্ট কাজ করে। এতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়, সেবার মান উন্নত হয় ও এয়ারলাইন্সগুলোও পছন্দমতো সেবাদাতা বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়া। যাত্রীরাও সুফল পান।'
বিদেশি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার বাছাইয়ের বিষয়ে ওয়াহিদুল আলম বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়া যোগ্যতা ও পরিচালনগত সক্ষমতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, যোগ্য অপারেটরদের সংক্ষিপ্ত তালিকা করার পর উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে চূড়ান্ত নির্বাচন করা উচিত, যাতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়া ভালো আর্থিক ও কারিগরি সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।
জোরালো হচ্ছে কূটনৈতিক লবিং
বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় তুরস্কের চেলেবি অ্যাভিয়াশনের আগ্রহের বিষয়টি নিয়া আলোচনা করতে ঢাকায় নিযুক্ত তুর্কি রাষ্ট্রদূত রামিস শেন গত মাসে বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দুবার সাক্ষাৎ করেছেন।
১২ মে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের পর মন্ত্রণালয়ার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মন্ত্রীরা আশ্বস্ত করেছেন, বাছাই প্রক্রিয়ায় চেলেবি অ্যাভিয়েশনের প্রস্তাবটি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হবে।
মন্ত্রণালয় জানায়, গত ২৪ মার্চ ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বিমান চলাচলমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে মেঞ্জিস অ্যাভিয়েশনের আগ্রহের কথা জানান।
গত ২১ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ আলী আব্দুল্লাহ আলহমুদি দুবাই-ভিত্তিক বিমান ও ভ্রমণ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডনাটার পক্ষে মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এরপর ১৬ জুন সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেংগলি বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে সুইসপোর্টের আগ্রহের বিষয়ে আলোচনা করেন।
