সংসদ অধিবেশনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ নেই: স্পিকার
জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি এবং অধিবেশন কক্ষের ভেতরে সংসদ সদস্যদের ছোট ছোট গ্রুপে আলোচনা করার ঘটনা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, 'কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ সংসদ অধিবেশনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। সব রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সংসদ অধিবেশন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।'
মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উত্থাপিত এক পয়েন্ট অব অর্ডারের পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার এ মন্তব্য করেন।
পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, 'সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে শুরু থেকেই স্পিকার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, যে মন্ত্রণালয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেই মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি সংসদ কক্ষে উপস্থিত থাকেন না। এটা সংসদের মেজাজের সঙ্গে যায় কি না, সে সিদ্ধান্ত স্পিকার দেবেন।'
তিনি বলেন, 'জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনুপস্থিতি তাদের আহত করে।'
শফিকুর রহমান আরও বলেন, 'মাঝেমধ্যে দেখা যায় সংসদ কক্ষে কোনো কোনো জায়গায় চার-পাঁচজন মিলে কথা বলছেন। এতে সংসদের পরিবেশ ও শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।'
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্পিকার বলেন, 'তিনিও মাঝেমধ্যে সংসদ কক্ষে ছোট ছোট গ্রুপে কথাবার্তা চলতে দেখেন। তিনি সংসদ সদস্যদের এ ধরনের আলোচনা না করা এবং যথাসম্ভব নিজ আসনে বসে সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানান।'
মন্ত্রীদের অনুপস্থিতির প্রসঙ্গে স্পিকার স্মরণ করিয়ে দেন, আগের দিনও বিরোধী দল একই বিষয় উত্থাপন করেছিল।
তখন চিফ হুইপ জানিয়েছিলেন, 'মন্ত্রীরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন।'
এ প্রসঙ্গে চিফ হুইপের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, 'আপনি মাননীয় মন্ত্রীদের বলবেন, তারা যেন সংসদে যথাসময়ে আসেন। সংসদ সদস্যের যেসব বক্তব্য তাদের মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কথা তারা বলেন, সেগুলোর ব্যাপারে তারা অন্তত শুনবেন এবং যদি সম্ভব হয় তার প্রতিকার করার চেষ্টা করবেন।'
তিনি আরও বলেন, 'রাষ্ট্রীয় অন্যান্য কাজের অজুহাতে সংসদকে উপেক্ষা করা গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ সংসদ অধিবেশনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা।'
উল্লেখ্য, সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে রয়েছেন। তার সফরসঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বিদেশে অবস্থান করছেন।
তবে বিরোধীদলীয় নেতা মন্ত্রীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি উত্থাপন করার সময় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানসহ ১০-১১ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সংসদ কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
অধিবেশনের শুরুতে রাজশাহী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদের নাম-ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর সম্বলিত ক্যাটালগ প্রকাশে বিলম্বের বিষয়টি উত্থাপন করেন।
জবাবে স্পিকার জানান, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের 'টেলিফোন সহায়িকা ২০২৬'- প্রকাশের কাজ চলমান রয়েছে। কয়েকজন সংসদ সদস্য এখনও তথ্য না দেওয়ায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। সংসদীয় কমিটিগুলো গঠিত হলেই ডাইরেক্টরি প্রকাশ করা হবে।
এ সময় চিফ হুইপ বলেন, 'বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঠিক যোগাযোগ নম্বর না থাকায় সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক কাজে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।'
তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ডাইরেক্টরি তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, 'সব গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন নম্বর সংবলিত একটি সম্মিলিত ডাইরেক্টরি দ্রুত প্রস্তুত করা হবে।'
বৈঠকে পয়েন্ট অব অর্ডারে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা, ঋণখেলাপি মামলায় নির্বাচিত দুই সংসদ সদস্যের বিষয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক গুঞ্জন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দাবি করেন।
তিনি বলেন, 'মির্জা আব্বাস ও শরিফ ওসমান বিন হাদিকে ঘিরে বিভিন্ন গুজব ছড়ানো হচ্ছে এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই গুঞ্জনকে আরও উসকে দিয়েছে।'
তবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলামের বিরোধিতা করে বলেন, 'মির্জা আব্বাস সম্পর্কে স্পিকার সংসদকে জানাতে পারেন, কিন্তু বিচারাধীন বিষয় বা সংসদের বাইরের অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারের নামে সময় নষ্ট করা উচিত নয়।'
পরে স্পিকার জানান, 'মির্জা আব্বাস চিঠি দিয়ে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির কথা জানিয়েছেন।'
তিনি বলেন, 'মির্জা আব্বাস চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন তার অবস্থা ক্রমাগত ভালো হচ্ছে।'
একই সঙ্গে স্পিকার স্পষ্ট করে বলেন, 'গুজব কে কী বলেছে, কার সম্পর্কে কী গুজব, এগুলো নিয়ে জাতীয় সংসদে সময় নষ্ট করা যাবে না। গুজব কখনো জাতীয় সংসদের বিবেচ্য বিষয় নয়।'
স্পিকার সদস্যদের চলমান ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'অযথা সংসদের সময় নষ্ট হয়—এমন কোনো বিষয় উত্থাপন করা উচিত নয়।'
