জুলাই গণহত্যা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের দায়ে দল হিসেবে আ.লীগের বিচার নিশ্চিতের দাবি
জুলাই গণহত্যা এবং গত ১৬ বছরে দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের দায়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জাতীয় সংসদে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও তৎকালীন গণহত্যার বিচার বিষয়ে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি জানান।
সেই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে চলমান রাজনৈতিক অপপ্রচার, গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলাগুলো ঘিরে কথিত 'মামলা বাণিজ্য' এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমে ধীরগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাহিদ ইসলাম।
বক্তব্যের শুরুতে নাহিদ ইসলাম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আন্দোলনের সব শহীদ, আহত ও ত্যাগী মানুষকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
ঐতিহাসিক ১৪ জুলাই এবং 'জুলাই উইমেন্স ডে'র প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের এই দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেদিন রাতে চীন সফর শেষে দেশে ফিরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের 'রাজাকারের নাতিপুতি' বলে কটূক্তি করেন। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগানে রাজপথে নেমে আসেন এবং আন্দোলনটি রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নারীদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৪ জুলাইকে 'জুলাই উইমেন্স ডে' হিসেবে পালন করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারকেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলের অপপ্রচারের অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় গণমাধ্যম এ আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। তবে দুঃখজনকভাবে আন্দোলনের অন্যতম শরীক রাজনৈতিক দল বিএনপির কিছু এমপি সংসদ ও টকশো-তে গিয়ে এই গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ আন্দোলনে মানুষের আত্মত্যাগ ও স্নাইপারের উপস্থিতিকে অস্বীকার করে একে 'সাজানো ছক' বা 'ডিজাইন' হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। এমনকি পুলিশের মৃত্যুর সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থানের শহিদদের তুলনা করে আওয়ামী লীগের তৈরি করা 'মিথ্যা বয়ান' প্রচার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ধরনের ইতিহাস বিকৃতির রাজনীতির নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান নাহিদ ইসলাম।
দেশজুড়ে দায়ের হওয়া গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলাগুলো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৪৯৯টি মামলা হয়েছে।
একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, যাচাই করা ৪০টি মামলার মধ্যে ২১টিতে মামলা দায়েরের আগে বা পরে আসামিদের কাছ থেকে অর্থ লেনদেন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার সঙ্গে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের কিছু নেতা জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ১৯টি মামলা হয়েছে ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে।
তার অভিযোগ, এসব মামলায় প্রকৃত গণহত্যাকারীদের পাশাপাশি নিরীহ ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিএনপিরই ভিন্নধারার নেতা-কর্মীদেরও আসামি করা হচ্ছে। তিনি এসব মামলার যাচাই-বাছাই উদ্যোগের বর্তমান অবস্থা সংসদে স্পষ্ট করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর আগের সফল প্রসিকিউশন টিমকে সরিয়ে দেওয়ার যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় এবং নতুন তিনটি মামলায় অভিযোগ গঠনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া আগের প্রসিকিউশন টিমই সম্পন্ন করে গিয়েছিল। অথচ বর্তমান প্রসিকিউশন নতুন কোনো মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও বর্তমান সরকার পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত। তাই বিচার দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ এবং প্রয়োজন হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপন করা উচিত।
বক্তব্যের শেষদিকে নাহিদ ইসলাম বলেন, ইতিহাসে দুই দফা গণতন্ত্র ধ্বংস করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং গণহত্যার অভিযোগে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, জুলাই গণহত্যার বিচারকে অর্থবহ করতে দলগতভাবে আওয়ামী লীগের বিচার অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ইতোমধ্যে হয়েছে। শুধু রায় দিলেই হবে না, দিল্লির সঙ্গে দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পলাতক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে সেই রায় দ্রুত কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।
