সিলেটের এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন, খালাস ৪
সিলেটের মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের আলোচিত মামলায় প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া রায়ে আরও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এই রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একমাত্র আসামি হলেন সাইফুর রহমান। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৩ আসামি হলেন—শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম রনি ও অর্জুন লস্কর।
অন্যদিকে, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর চার আসামি আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ও মাহফুজুর রহমানকে খালাস দিয়েছেন আদালত। সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন রায়ের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী বলেন, 'এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষ্য দেয়নি। ভিকটিমও [ভুক্তভোগী] আসামিদের শনাক্ত করেননি। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব।'
এর আগে সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ৮ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আসামিরা সাংবাদিকদের উদ্দেশে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে বলেন, 'আমরা ধর্ষণকারী না ভাই, আমরা ধর্ষণ করিনি। রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে আমাদের মামলার আসামি করা হয়েছে। ভিকটিমও আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেনি।'
সে রাতে যা ঘটেছিল
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্বামীর সঙ্গে প্রাইভেটকারে চড়ে শাহপরাণ মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন ওই তরুণী (২০)। ফেরার পথে টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামিয়ে পাশের দোকানে যান তাঁর স্বামী। এ সময় ৫-৬ জন তরুণ এসে তাদের জিম্মি করে প্রাইভেটকারসহ বালুচর এলাকায় এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে স্বামীকে মারধর করে বেঁধে রেখে ওই তরুণীকে ছাত্রাবাসের ভেতরে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। পরে স্বামীর টাকা-পয়সা ও প্রাইভেটকার কেড়ে রেখে তাদের ছেড়ে দেয় ধর্ষকেরা।
ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে তরুণীর স্বামী ঘটনাটি পুলিশকে জানালেও অভিযুক্তরা তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) কর্মী হওয়ায় পুলিশ প্রথমে ছাত্রাবাসে প্রবেশে গড়িমসি করে। এই সুযোগে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ রাতভর অভিযান চালিয়ে ছাত্রাবাসের বিভিন্ন কক্ষ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় তরুণীর স্বামী বাদী হয়ে মহানগর পুলিশের শাহপরাণ থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেন। ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে ছয় আসামি ও সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র্যাব। গ্রেপ্তারের পর তাদের পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরে সব আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার দায় স্বীকার করেন। আসামিদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষায় আটজনের মধ্যে ছয়জনের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়।
২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা ও মহানগর পুলিশের শাহপরাণ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য।
অভিযোগপত্রে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজনকে দল বেঁধে ধর্ষণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। অপর দুই আসামি রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমকে ধর্ষণে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্তরা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ঘটনার পর অভিযুক্ত ৮ জনকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও এই ৪ জনের ছাত্রত্ব ও সার্টিফিকেট বাতিল করে। এছাড়া ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সাইফুর রহমান ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে আসামি করে পৃথক অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মামলার রায়
২০২০ সালের ২২ নভেম্বর অস্ত্র ও চাঁদাবাজি মামলার এবং ৩ ডিসেম্বর ধর্ষণ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় পুলিশ। ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল ধর্ষণ মামলায় এবং ২০২২ সালের ১১ মে একই আদালত অস্ত্র ও চাঁদাবাজি মামলায় অভিযোগ গঠন করেন।
বাদীপক্ষে দুটি মামলার বিচার কার্যক্রম একসঙ্গে একই আদালতে শুরু করার জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন জানালে ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে হাইকোর্ট মামলা দুটির কার্যক্রম একসঙ্গে করার আদেশ দেন। পরবর্তীতে মামলার বিচার কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিলে বাদীপক্ষের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলা দুটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বদলির নির্দেশ দেন।
রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনের পর গত বছরের মে মাসে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয় এবং দ্রুত সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলায় নির্যাতিতা গৃহবধূ, তার স্বামী, জবানবন্দি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আজ এই রায় ঘোষণা করলেন আদালত।
