সুন্দরবনের বড় বনদস্যু দল ‘ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী’র ২৭ সদস্যের আত্মসমর্পণ
সুন্দরবনের অন্যতম বড় বনদস্যু দল 'ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী'র প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ ২৭ জন সক্রিয় সদস্য বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। এ সময় তারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেন।
সোমবার বিকেল ৫টার দিকে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবনের চরপুটিয়া খালসংলগ্ন এলাকায় তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। মঙ্গলবার দুপুরে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, আত্মসমর্পণের সময় দস্যুরা তিনটি বিদেশি বন্দুক, একটি এইট শুটার, একটি ফোর শুটার, পাঁচটি দেশীয় একনলা বন্দুক, ১৫টি দেশীয় পাইপগান, দুটি চায়না পাইপগান, ৩৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ এবং ৫৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ জমা দেন।
আত্মসমর্পণকারীদের অধিকাংশই খুলনার দাকোপ, কয়রা ও বটিয়াঘাটা এবং বাগেরহাটের রামপাল, ফকিরহাট, কচুয়া, মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে একজন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, জব্দ করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সরকারের পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, "বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সুন্দরবনে সক্রিয় সব বনদস্যুর প্রতি আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখলে সরকারের 'জিরো টলারেন্স' নীতির আওতায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
কোস্ট গার্ডের তথ্যমতে, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে ডাকাতি, জেলে ও বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।
সংস্থাটি জানায়, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং বনদস্যু নির্মূলে সরকারের নির্দেশনায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে 'অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন' ও 'অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড' নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
কোস্ট গার্ডের দাবি, এসব অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪৫ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ৪২ জনকে জীবিত উদ্ধার করে চিকিৎসা শেষে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সংস্থাটির ভাষ্য, ধারাবাহিক অভিযানের ফলে সুন্দরবনে সক্রিয় দস্যু বাহিনীগুলো ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এর আগে ছোট সুমন বাহিনীর সাত সদস্য এবং বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর তিন সদস্য অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। সর্বশেষ ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ ২৭ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করলেন।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, "সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে নিয়মিত অভিযান এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কোস্ট গার্ড।"
সুন্দরবনে বনদস্যুতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে ২০১৬ সালের ৩১ মে থেকে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত র্যাবের অভিযানে সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করেন। এ সময় ৪৬২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদও জমা দেওয়া হয়। এরপর ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন।
র্যাব-৬ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে বাহিনীটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ৩৭০টির বেশি অভিযান পরিচালনা করে। এসব অভিযানে ৯১১ জন বনদস্যুকে গ্রেপ্তার এবং ২ হাজার ২৮টি অস্ত্র ও ৪২ হাজার ৬৯০ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।
তবে গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে সুন্দরবনে আবারও বনদস্যুদের তৎপরতা শুরু হয়। পরে বনদস্যু দমনের দায়িত্ব বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে দেওয়া হয়।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, কোস্ট গার্ডের চলমান অভিযানের ফলে সুন্দরবন আবারও দস্যুমুক্তির পথে রয়েছে। তিনি বলেন, "বনদস্যু নির্মূলে নিয়মিত অভিযান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ টহল এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।"
