অতিবৃষ্টিতে ২৮,৬১০ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত; আমনের চারা ও সবজি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা
দেশজুড়ে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় অন্তত ১২ জেলার ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আসন্ন আমন মৌসুমে চারার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে।
ডিএইর হিসাবে, সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে মোট ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭০ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টরের ফসল সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এটি প্রাথমিক হিসাব। বন্যার পানি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হবে। তখন আক্রান্ত জমির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানসহ দেশের ১২ জেলার কৃষিজমি ভারী বর্ষণে আক্রান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, টানা বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজি ও পানবরজের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি জেলাগুলোতে ক্ষতির মাত্রা তুলনামূলক বেশি।
রাঙামাটিতে আউশ, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আদা, হলুদ, আমনের বীজতলা ও ফলের বাগান মিলিয়ে ৩ হাজার ৪৯৫ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে।
খাগড়াছড়িতে আউশ, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আমনের বীজতলা ও ফলের বাগান মিলিয়ে ১ হাজার ৩১ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে।
বান্দরবানে আমনের বীজতলা, আউশ, গ্রীষ্মকালীন সবজি, সমতল ও পাহাড়ি ফলের বাগান, জুম আউশ, আদা ও হলুদসহ নয় ধরনের ফসলের ৯৪৫ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে।
চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর আউশ, ৫৬৫ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৪ হাজার ১৬৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির জমি আক্রান্ত হয়েছে।
কক্সবাজারে আউশ, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি ও পানবরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের নওগাঁয় সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৩৪০ হেক্টর আউশের জমি আক্রান্ত হয়েছে।
হবিগঞ্জে ১ হাজার ২৫৯ হেক্টর আউশ, ১৫০ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ২৩৩ হেক্টর সবজির জমি আক্রান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া যশোর, চুয়াডাঙ্গা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে আউশ, পাট, মরিচ, কলা, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজির জমি আক্রান্ত হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন সবজি ও আমনের বীজতলায়।
আমনের চারা নষ্ট হলে অনেক এলাকায় কৃষকদের নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হতে পারে। এতে আমন চাষের সময়সূচি পিছিয়ে যেতে পারে।
একই সঙ্গে মাঠে থাকা সবজি নষ্ট হলে বাজারে সরবরাহ কমে দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
খোয়াই, মনু, কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জের মারকুলি ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে সারি-গোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভোগাই-কংস নদীর পানিও কয়েকটি স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চলের কৃষিজমি নতুন করে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মোহাম্মদ নাজমুল কবির বলেন, চেরাপুঞ্জিতে এখন পর্যন্ত তুলনামূলক কম বৃষ্টি হওয়ায় বড় ধরনের বন্যা সৃষ্টি হয়নি।
তবে এলাকাটি পাহাড়ি ঢলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমনের বীজতলা ও আউশের বড় ধরনের ক্ষতি এড়াতে মাঠপর্যায়ে নিবিড় নজরদারি রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ড. ফারুক আহমেদ বলেন, বর্ষা শুরুর আগেই অধিকাংশ গ্রীষ্মকালীন খরিফ শস্য মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তাই সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা কম।
তবে মাঠে থাকা শাকসবজি, কাঁচা মরিচ ও নতুন আমন বীজতলা আক্রান্ত হলে স্বল্পমেয়াদে বাজারে প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় পিরামিড পদ্ধতিতে চাষ করলে পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হয়। এতে গাছের শিকড় পচে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।
