ভারী বৃষ্টি ও উত্তাল সাগরে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত, দেশজুড়ে সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা
টানা পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টি ও উত্তাল সাগরের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে পণ্য খালাস ও সরবরাহের গতি কমে যাওয়ায় দেশজুড়ে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে আমদানি করা পণ্য দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো যাচ্ছে না।
একই সময়ে বন্দরের টার্মিনাল ও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোগুলোতে (আইসিডি) জলাবদ্ধতায় আমদানি করা পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন আমদানিকারক ও কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টরা।
তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ঘটনাটিকে 'প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত' ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক বাজারে গম, ভোজ্যতেল, চিনি, সার, ক্লিংকারসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের সংকট দেখা দিতে পারে।
এই বিঘ্নের প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জেও পড়তে শুরু করেছে। সেখানে দৈনিক বেচাকেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
স্বাভাবিকের কম পণ্য ওঠানো-নামানো কার্যক্রম
বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে পণ্য ওঠানো-নামানো ও কনটেইনার সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। তবে ধীরে ধীরে কার্যক্রমে কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
৭ জুলাই বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং কমে ৪ হাজার ৭৯৭ টিইইউতে নেমে আসে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক গড়ে ৯ হাজার থেকে ১১ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। পরে ৮ জুলাই তা বেড়ে ৫ হাজার ২৩০ টিইইউ, ৯ জুলাই ৬ হাজার ৪১৪ টিইইউ এবং ১০ জুলাই ৭ হাজার ১৪৬ টিইইউতে পৌঁছায়। তবে এসব পরিমাণ এখনো স্বাভাবিক গড়ের তুলনায় অনেক কম।
কনটেইনার সরবরাহও ছিল সীমিত। ৮ জুলাই বন্দর থেকে মাত্র ২ হাজার ৬০৬ টিইইউ কনটেইনার সরবরাহ করা হয়। ৯ জুলাই তা বেড়ে ২ হাজার ৮২০ টিইইউ এবং ১০ জুলাই ৩ হাজার ৪৫২ টিইইউতে দাঁড়ায়। তবু তা স্বাভাবিক পরিচালন সক্ষমতার চেয়ে অনেক নিচে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য পরিবহন ধীর হয়ে পড়ায় শিল্প উৎপাদন বিলম্বিত হচ্ছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আটকা পড়েছে ৬০টির বেশি জাহাজ
বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সারওয়ার হোসেন সাগর বলেন, উত্তাল সাগরের কারণে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৬০টির বেশি জাহাজ অপেক্ষমাণ রয়েছে।
তিনি বলেন, "অপেক্ষণমান প্রতিটি জাহাজের জন্য দৈনিক প্রায় ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার ডলার ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে।"
তার হিসাবে, এ খাতে প্রতিদিন ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ ডলার বা প্রায় ১৫ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। গত পাঁচ দিনে মোট ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় এ কাজে নিয়োজিত ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার শ্রমিক কর্মহীন রয়েছেন।
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, উত্তাল সাগরের কারণে গত পাঁচ দিন ধরে মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে কোনো পণ্য স্থানান্তর করা যায়নি।
তিনি বলেন, "আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় লাইটার জাহাজগুলো কর্ণফুলী নদী ও পতেঙ্গা বহির্নোঙরে অবস্থান করছে। সাগর উত্তাল থাকলে অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহনও বন্ধ থাকবে।"
তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের ৭০ শতাংশের বেশি নৌপথে হয়। এই বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে দেশের বিভিন্ন গুদামে পণ্য সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে গম, চিনি, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পড়ছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান মিন্টু বলেন, পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন ও পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ায় বাজারে দৈনিক লেনদেন স্বাভাবিক সময়ের ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি টাকা থেকে কমে প্রায় ৩০ কোটি টাকায় নেমেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, চট্টগ্রাম থেকে পণ্য সরবরাহের গতি আরও কমে গেলে গ্রামীণ বাজারেও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সংকট দেখা দিতে পারে।
উৎপাদন ব্যাহত পোশাক কারখানায়
বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাক খাতেও।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, নিম্নাঞ্চলের আবাসিক এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতার কারণে গত পাঁচ দিনে অনেক শ্রমিক কারখানায় যেতে পারেননি।
তিনি বলেন, "অন্তত দুই কর্মদিবসে শ্রমিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে কিছু কারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়, আর কয়েকটি কারখানা সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখে।"
উৎপাদনের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে কারখানাগুলোকে অতিরিক্ত শিফটে কাজ করতে হবে বলেও জানান তিনি।
বন্দর থেকে আমদানি করা কাঁচামাল খালাসে দেরি হলে শিল্পের উপকরণে সংকট দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন আবু তৈয়ব। দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু না হলে এতে তৈরি পোশাক উৎপাদন আরও ব্যাহত হতে পারে।
আবহাওয়া অনুকূলে আসামাত্র বন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম দ্রুত চালু করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের ক্ষতিপূরণ চান আমদানিকারকেরা
আমদানিকারক ও পণ্য পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বন্দরের ইয়ার্ড ও কয়েকটি বেসরকারি কনটেইনার টার্মিনালে জলাবদ্ধতার কারণে কনটেইনারে রাখা আমদানি পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন বলেন, বন্দরের ভেতরে পর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকায় পানি জমেছে।
তিনি বলেন, "উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়নি।"
ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, এই জলাবদ্ধতা বন্দরের নিষ্কাশন অবকাঠামোর দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে।
তিনি বলেন, "আধুনিক বন্দরে এমন বিকল্প নিষ্কাশনব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে চরম বৈরী আবহাওয়ার সময় দ্রুত বৃষ্টির পানি সরিয়ে ফেলা যায়।"
তার অভিযোগ, শুধু বন্দরের ইয়ার্ডেই নয়, চার থেকে পাঁচটি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে আমদানিকারকদের পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্বল অবকাঠামোর কারণে ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ডিপো পরিচালনাকারীদেরও এর দায় নিতে হবে।
ডিপোগুলোতে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
দায় নেবে না বন্দর কর্তৃপক্ষ
শুক্রবার এক গণবিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ৫ জুলাই থেকে টানা বৃষ্টি ও বন্দর-সংরক্ষিত এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে তার দায় তারা নেবে না।
আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিপিং এজেন্ট ও অন্যান্য বন্দর ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনাটিকে 'প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত' বলে উল্লেখ করা হয়।
এতে 'রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চিটাগং পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কনটেইনার), ২০০১'-এর ১৯৯(১৪) ধারা উল্লেখ করে বলা হয়, এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবির ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ আইনগতভাবে দায়মুক্ত।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, 'চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২' এবং 'রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চিটাগং পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কনটেইনার), ২০০১'—উভয় আইনের আওতায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো দায়ও কর্তৃপক্ষের নেই।
বন্দরের টার্মিনালে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
