বান্দরবানে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, আশ্রয়কেন্দ্রে শতাধিক পরিবার
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বান্দরবান শহরের কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শহরের হাফেজ ঘোনা, কাসেম পাড়া, আর্মি পাড়া, বনানী স'মিল এলাকা, বালাঘাটার আমবাগান পাড়া এবং সাঙ্গু নদীর পাড়ের বসতঘরে পানি উঠেছে।
প্লাবিত এলাকার বাসিন্দারা মঙ্গলবার রাত থেকে প্রশাসনের নির্ধারিত বিভিন্ন সরকারি স্কুলে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে খিচুড়ি, শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও মোমবাতি বিতরণ করেছে জেলা প্রশাসন।
মঙ্গলবার রাতে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গিয়ে দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস।
বুধবার সকালে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, নিম্নাঞ্চলের মানুষ পরিবার নিয়ে কাছের স্কুলগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয় নেওয়া মানুষের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যা বেশি। কক্ষের মেঝেতে বিছানা পেতে গাদাগাদি করে থাকতে দেখা গেছে তাদের।
তবে দুটি আশ্রয়কেন্দ্রের কয়েকজন খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা পারভিন আক্তার বলেন, "পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বুধবার ভোরে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছি। চুলা সম্পূর্ণ ডুবে গেছে। রান্না করা যায়নি। শুনলাম আগে যারা এসেছে, তাদের চাল, ডাল ও শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। আমরা কিছু পাইনি।"
একই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ৬৫ বছর বয়সী এক নারী বলেন, "আমরা গতকাল রাতেই উঠেছি। কিছু খাওয়ার সুযোগ হয়নি। কাউকে কাউকে খাবার দিয়েছে শুনলাম। সকালে পাশের দোকান থেকে নাস্তা কিনে খেয়েছি।"
তবে আবু তাহের নামে আশ্রয় নেওয়া এক ব্যক্তি জানান, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া বেশিরভাগ মানুষ সাঙ্গু নদীর পাড়ের বাসিন্দা। পানি বাড়তে থাকায় মঙ্গলবার রাতে তারা আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসেন। তিনি বলেন, "আমরা রাতে খাবার পেয়েছি। সকালেও খিচুড়ি দিয়েছে।"
সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বুধবার সকাল পর্যন্ত ৬০টির বেশি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। স্কুলের দাপ্তরিক কাজে দায়িত্বে থাকা মো. কামাল জানান, সকালে প্রশাসনের লোকজন আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন।
শহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও কক্ষের মেঝেতে বিছানা পেতে গাদাগাদি করে থাকছেন অনেকে। কেউ কেউ ঘরের হাঁস-মুরগিও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। আশ্রয় নেওয়া মানুষের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। তাদের সঙ্গে থাকা পুরুষদের অনেকে সকালে কাজে বের হয়ে গেছেন বলে জানান তারা।
সাঙ্গু নদীর পাড়ের মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে আসা রবিউল জানান, পানি বাড়ার পর রাত ২টার দিকে তারা আশ্রয়কেন্দ্রে আসেন। ঘরের মালামাল সরাতে দেরি হওয়ায় তাদের আসতেও দেরি হয়েছে।
তিনি বলেন, "অর্ধেক জিনিসপত্র ডুবে গেছে। স্কুলের একটি কক্ষে নয়টি পরিবারের লোকজন গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। রাতে আমরা নিজেদের উদ্যোগে খেয়েছি। সকালে প্রশাসনের লোকজন এসে নামের তালিকা করে গেছে।"
শহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোহের আজাদ টিবিএসকে বলেন, "এখানে পৌর এলাকার ইসলামপুর, আর্মি পাড়া, বনানী স'মিল ও মোহাম্মদপুর—এই চার এলাকার ৭৫টি পরিবারের ২৬৫ জন সদস্য রয়েছেন। তাদের দুপুরের খাবার দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা আরও বেশি ছিল; প্রায় ৪০০ জন এসেছিল।"
তিনি জানান, স্কুলে সর্বোচ্চ ৪০০ জনের থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব, তবে সেক্ষেত্রে গাদাগাদি করে থাকতে হবে।
এদিকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল টিম কাজ করছে।
সদর উপজেলার স্যানিটারি পরিদর্শক নাঈম উদ্দিন বলেন, "সকাল থেকে পাড়া স্কুল কেন্দ্র, বাসস্টেশন কেন্দ্র, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং শহর মডেল স্কুল কেন্দ্র পরিদর্শন করা হয়েছে। কয়েকজন অসুস্থ রোগী পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে পানিবাহিত রোগ, সর্দি, কাশি ও হালকা জ্বরের উপসর্গ রয়েছে। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।"
থানচি উপজেলার পরিস্থিতি জানতে ইউএনও আব্দুল্লাহ আল ফয়সালের সঙ্গে বুধবার সকাল থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ না থাকায় মঙ্গলবার রাত থেকে থানচি ইউএনও কার্যালয়ের টেলিটক নম্বর বন্ধ রয়েছে। এর আগে ভারী বৃষ্টির কারণে তিন্দু ও নাফাকুম জলপ্রপাতের দিকে যাওয়া পর্যটকরা আটকা পড়লেও মঙ্গলবারের মধ্যে সবাই ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছেন থানচি প্রেস ক্লাবের সভাপতি মংবোয়াচিং মারমা অনুপম।
রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা আক্তার বিথি টিবিএসকে বলেন, "পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় পানি বেড়ে রাস্তা ও কালভার্ট ডুবে গিয়েছিল, পরে আবার স্বাভাবিক হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণার পর অধিকাংশ পর্যটক ফিরে গেছেন। কোনো পর্যটক আটকে থাকার খবর নেই।"
বান্দরবানে বুধবার তৃতীয় দিনের মতো থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। সকালে আবহাওয়া কিছুটা শুষ্ক থাকলেও সকাল ১০টার পর আবার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। টানা বৃষ্টির কারণে শহরের মধ্যম পাড়ায় সাপ্তাহিক মারমা বাজার বসেনি। সকাল থেকে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতিও ছিল কম।
জেলা শহর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ও উপজেলা পর্যায়ে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে শহরের পাশের কালাঘাটা এলাকায় বেইলি ব্রিজ ডুবে যাওয়ায় রোয়াংছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে কিছু মোটরসাইকেল চলাচল করছে।
বান্দরবান আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা সনাতন কুমার মণ্ডল জানান, বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবানে ১৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা ভারী বৃষ্টিপাত হিসেবে ধরা হয়।
তিনি বলেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বুধবার বিকেল ৩টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় কোথাও কোথাও ভূমিধস হতে পারে বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, টানা ভারী বৃষ্টির কারণে জেলার সাত উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবান সদরে ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, লামায় ৫৫টি, আলীকদমে ১৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বান্দরবান সদর ছাড়া অন্যান্য উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো কেউ আসেনি। ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে। প্রয়োজনে কাজ করার জন্য তিনটি সেনা টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "মাঠে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাখা হয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের দুটি টিম ও আনসারের দুটি টিমও কাজ করছে। মঙ্গলবার রাতের দুর্যোগ ছাড়া আজ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সেবা অব্যাহত রয়েছে।"
আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, "বান্দরবান সদরে বুধবার দুপুরে শুরুতে ২৫০ জনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে সংখ্যা বাড়ায় সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার আছে, কোনো সংকট নেই। আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা ৫০০ জন বা আরও কয়েক গুণ বাড়লেও আট-দশ দিনের খাবারের ব্যবস্থা আছে। ইউএনওদের কাছেও পর্যাপ্ত খাবার মজুত আছে।"
ছবি: উসিথোয়াই মারমা
