ব্যয়বহুল ড্রেনেজ প্রকল্পের পরও বর্ষায় মাতুয়াইলে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি কাটেনি
প্রতিবছর বর্ষা এলেই রাজধানীর মাতুয়াইলের শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের হাজারো শিক্ষার্থীকে দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পানি মাড়িয়ে শ্রেণিকক্ষে যেতে হয়।
টানা বা মাঝারি বৃষ্টির পরই স্কুলের প্রবেশপথ ও আশপাশের সড়ক ডুবে যায় পানিতে। অপর্যাপ্ত ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না। একপর্যায়ে উপচে পড়া ড্রেনের পানি পয়ঃবর্জ্য ও কঠিন বর্জ্যের সঙ্গে মিশে যায়, যা শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করছে।
ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা বা সংক্ষেপে ডিএনডি এলাকার এই জলাবদ্ধতা নিরসনে ১ হাজার ২৯৯ কোটি টাকার ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পে বছরের পর বছর বিনিয়োগ করা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
এর প্রভাব শুধু শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আশপাশের কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী বর্ষা মৌসুমে যাতায়াতে সময় ভোগান্তিতে পড়ে। সব মিলিয়ে আশপাশের এলাকার প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার মানুষ প্রতিবছর বর্ষায় জলাবদ্ধতার শিকার হন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই জলাবদ্ধতা এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শামীমা মেহেরিন বলেন, "ভারী বৃষ্টির পর আমি অটোরিকশায় যাচ্ছিলাম। তখন সড়ক আর পাশের খালের মধ্যে কোনো পার্থক্য বোঝা যাচ্ছিল না। কোথায় রাস্তা শেষ হয়েছে আর কোথায় খাল শুরু হয়েছে, তা বোঝার উপায় ছিল না। অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি।"
অপরিকল্পিত নগরায়ণকে দায়ী করছেন বাসিন্দারা
স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে, দ্রুত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন পথ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক মিল্টন হোসেন মোল্লা বলেন, "অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ ও অসংখ্য বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন পথ ভরাট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে আশপাশের উন্নয়নকাজের তুলনায় অনেক সড়ক এখনও নিচু অবস্থায় থাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকে।"
তিনি জানান, স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনলেও কোনো সমাধান হয়নি।
মিল্টন হোসেন বলেন, "বৃষ্টি হলেই হাজারো শিক্ষার্থী ভোগান্তিতে পড়ে। সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আমরা মানববন্ধনও করেছি।"
তিনি আরও জানান, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্কুলের অধ্যক্ষ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
ভারী বৃষ্টি হলেই ক্ষতির মুখে পড়েন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও।
দোকানিরা বলছেন, জমে থাকা পানির কারণে ক্রেতারা বাজারে আসতে চান না। মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে এবং চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বর্ষা মৌসুমে তাদের উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়।
সমাধান বিলম্বিত
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, সড়কের মালিকানা একাধিক সংস্থার অধীনে থাকায় স্থায়ী সমাধানের পথে বড় বাধা তৈরি হয়েছে।
স্কুল এলাকাটি সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হলেও আশপাশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এখনও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে রয়েছে। ফলে সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "আন্তঃমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এসব সড়ক সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং থাকবে।"
তিনি বলেন, আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোতেও পরিকল্পিত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক নেই। ফলে নিচু সড়কগুলোতে বর্জ্যপানি জমে থাকে। ভারী বৃষ্টির পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অস্থায়ী পাম্প বসিয়ে পানি অপসারণ করলেও এসব ব্যবস্থা কেবল স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি দেয়।
তার ভাষ্য, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে সিটি করপোরেশন বারবার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে এখনও কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বাস্তবায়ন হয়নি।
বর্তমানে সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডের জন্য একটি সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিকী ভূঁইয়া বলেন, মূল ডিএনডি বাঁধ প্রকল্পে নতুন যুক্ত হওয়া এসব ওয়ার্ডের জন্য সমন্বিত ড্রেনেজ কৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়ে গেছে।
তিনি জানান, প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যানে প্রথমে খালগুলো পুনরুদ্ধার ও দখলমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এরপর সেগুলোকে আশপাশের নদীর সঙ্গে পুনঃসংযোগ করে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সফিউল্লাহ সিদ্দিকী ভূঁইয়া বলেন, শিমরাইল পাম্প স্টেশনের আউটলেটে পানির স্তর এখনও নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। তবে অনেক খাল দখল হয়ে গেছে বা প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলি জমে বন্ধ হয়ে আছে। ফলে পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারছে না।
মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নাধীন
নগরের জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বেশ কিছু পদক্ষেপের রূপরেখা তৈরি করেছে।
তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ড্রেন ও খাল পরিষ্কার, পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা অপসারণ, পোর্টেবল পাম্প ব্যবহার, পাম্পিং স্টেশন উন্নয়ন এবং জরুরি সাড়া প্রদানকারী দলকে আরও শক্তিশালী করা।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় খাল পুনরুদ্ধার, বুড়িগঙ্গা নদীতে পানি নিষ্কাশনের জন্য নতুন ড্রেনেজ আউটলেট নির্মাণ এবং নগর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে জিয়া সরণি, কাজলা ও মৃধাবাড়ি খালসহ প্রায় ৫০ কিলোমিটার খাল উন্নয়ন। পাশাপাশি নতুনভাবে সিটি করপোরেশনে যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলোতে সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ডিএনডি প্রকল্পেও স্বস্তি মেলেনি
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে চুক্তির পর ডিএনডি এলাকার পানি নিষ্কাশন উন্নয়ন প্রকল্পটি শুরু হয়। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৮২ কোটি টাকা। পরে ২০২০ সালে তা সংশোধন করে প্রায় ১ হাজার ২৯৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
২০১৮ সালে বাস্তবায়নকাজ শুরুর পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আদমজী ও শিমরাইলে দুটি বড় পাম্প স্টেশন স্থাপন করেছে। এছাড়া ফতুল্লা, পাগলা ও শ্যামপুরে পাম্পিং প্ল্যান্ট স্থাপন, ২২টি সেতু ও ৬৯টি কালভার্ট নির্মাণ বা মেরামত, চারটি ক্রস-ড্রেন কাঠামো নির্মাণ এবং ৪৪ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এত কাজের পরও প্রকল্পটি তাদের ভোগান্তি কমাতে পারেনি।
এর মধ্যেই আরেকটি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। গত ৩ জুন এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর পানিসম্পদ মন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানান, ডিএনডি এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সরকার একটি পরিকল্পনা করছে। এর আওতায় অতিরিক্ত ৩০ কিলোমিটার ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টিও রয়েছে।
তবে মাতুয়াইলের বাসিন্দাদের জন্য এসব প্রতিশ্রুতি এখনো বড় কোনো স্বস্তি আনতে পারেনি। কারণ বর্ষা এলেই পানিতে ডুবে যাওয়া সড়ক তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত করে চলেছে।
