মেটার নীতিমালায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ফেসবুক থেকে আয় করছেন বাংলাদেশের ১৩ এমপি
গত ৪ মার্চ এনটিভিতে প্রচারিত একটি ভিডিওতে নিজের মোবাইল ফোন উঁচিয়ে ধরে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে কীভাবে কনটেন্টের মাধ্যমে আয় করা যায়, তা দর্শকদের দেখান হাসনাত আবদুল্লাহ।
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এই নেতা দেখান যে, তার একটি ছবি লাখ লাখ বার ভিউ হওয়ার পর সেখান থেকে ৩৩০ ডলার আয় হয়েছে। তিনি আরও একটি ভিডিও দেখান, যা থেকে ৪০ ডলার আয় হয়েছে এবং জানান যে, কেবল মার্চের প্রথম দুই দিনেই তার অ্যাকাউন্ট থেকে ১২৯ ডলার আয় হয়েছে।
'হোয়াট টু ফিক্স'-এর রক্ষণাবেক্ষণ করা মনিটাইজেশন আর্কাইভ অনুযায়ী, হাসনাতের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি মেটার মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয় এবং ৫ এপ্রিল তা তালিকা থেকে বাদ পড়ে।
তবে হাসনাতের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না।
মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকা বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাব দেখেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের আরও অন্তত ১৩টি ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে অর্থ উপার্জনের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, এই সবগুলো অ্যাকাউন্টই মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে সক্রিয় ছিল।
এই অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে তিন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পেজ ও প্রোফাইলও রয়েছে। ডিসমিসল্যাব এই ১৩টি ভেরিফাইড অ্যাকাউন্টের মধ্যে ১২টি থেকে পোস্ট করা ভিডিওতে বিজ্ঞাপন চলতে দেখেছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি ভেরিফাইড অ্যাকাউন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যুক্ত হয়েছিল।
এছাড়াও ডিসমিসল্যাব মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় বাংলাদেশের আইনপ্রণেতা ও মন্ত্রীদের নামে খোলা আরও ২২টি আনভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অ্যাকাউন্ট থেকে নির্বাচনি প্রচারণার সময় ফেসবুকে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন চালানো হয়েছিল।
মেটার নিজস্ব মনিটাইজেশন নীতিমালা অনুযায়ী, বর্তমান নির্বাচিত প্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রার্থী, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দল এবং সরকারি সংস্থাসমূহের মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে অর্থ উপার্জনের কোনো সুযোগ নেই।
এই তথ্যগুলো মেটার মনিটাইজেশন প্রক্রিয়ায় অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একই সাথে মেটা তার নিজস্ব রাজনৈতিক যোগ্যতা সংক্রান্ত নিয়মগুলো প্রয়োগ করছে কি না, এবং যেসব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এই প্ল্যাটফর্মটি রেগুলেট করার ক্ষমতা থাকতে পারে, তাদের এর সাথে কোনো আর্থিক সম্পর্ক বজায় রাখার অনুমতি দেওয়া উচিত কি না—সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মেটার মনিটাইজেশন তালিকা যা দেখাচ্ছে
মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় একটি নির্দিষ্ট তারিখে কোম্পানির মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত থাকা পেজ এবং প্রোফাইলগুলোর পরিচয় পাওয়া যায়।
মেটার ভাষ্যমতে, এই তালিকায় এমন পাবলিশারদের নাম থাকে যারা মনিটাইজেশনের জন্য আবেদন করেছে এবং এর 'পার্টনার মনিটাইজেশন পলিসি' অনুসরণ করে। তালিকাটি তাদের ব্র্যান্ড সেফটি অ্যান্ড সুইটেবিলিটি সেন্টার থেকে সর্বসাধারণের জন্য ডাউনলোডযোগ্য।
ডিসমিসল্যাব এই তালিকার একটি পুরাতন আর্কাইভও ব্যবহার করেছে, যা নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মনিটাইজেশন নীতিমালা ও স্বচ্ছতা তদারককারী সংস্থা 'হোয়াট টু ফিক্স' রক্ষণাবেক্ষণ করে। এই আর্কাইভে অ্যাকাউন্টগুলো কবে মেটার মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে যোগ দিয়েছে, কোন কোন প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছে এবং অ্যাকাউন্টগুলো এখনো সক্রিয় আছে নাকি পরবর্তীতে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তার রেকর্ড থাকে।
'হোয়াট টু ফিক্স'-এর মতে, পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় কোনো অ্যাকাউন্টের নাম থাকার অর্থ হলো—সেটি একটি নির্দিষ্ট তারিখে মেটার মনিটাইজেশন সিস্টেমে প্রবেশ করেছে এবং কোম্পানির অনুমোদন প্রক্রিয়া সফলভাবে পার হয়েছে।
মেটার পার্টনার মনিটাইজেশন নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, বর্তমান নির্বাচিত ও নিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তা, বর্তমান রাজনৈতিক প্রার্থী, রাজনৈতিক দল, নিবন্ধিত রাজনৈতিক কমিটি এবং সরকারি সংস্থা ও দপ্তরসমূহ মনিটাইজেশনের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।
