কর ফাঁকির কারণে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে সরকার: সিপিডি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও কর ব্যবস্থায় বৈষম্য, নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ, সেবাখাতে কম বরাদ্দ এবং রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও কর বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও ক্রিশ্চিয়ান এইড আয়োজিত 'ট্যাক্স জাস্টিস অ্যাসেসমেন্ট অব দ্য ন্যাশনাল বাজেট ২০২৬-২৭' শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব তথ্য ও উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।
সভায় উপস্থাপিত সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর ফাঁকির কারণে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। এছাড়া সম্ভাব্য ভ্যাট আদায়ের মাত্র ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এনবিআরের মোট রাজস্বের প্রায় ৬৫ থেকে ৬৬ শতাংশ এখনও পরোক্ষ কর থেকে আসে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ১.০১ শতাংশ, যা কাঙ্ক্ষিত ৫ শতাংশের অনেক নিচে।
তবে প্রতিবেদনে বাজেটের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত আয়করের জন্য পাঁচ বছরের রোডম্যাপ, ২০২৯ সাল থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ করহার, স্বয়ংক্রিয় অডিট ব্যবস্থা, এনবিআর-এনআইডি-ব্যাংক তথ্য সমন্বয়, সিম কর প্রত্যাহার এবং নারীপ্রধান পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর করনীতির প্রভাব এবং রাজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সম্পর্কের ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান আহমেদ বলেন, ''এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরাজমান দূরত্ব কমাতে হবে। দেশের অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠী। তাদের বিকাশের সুযোগ না দিলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।'' একই সঙ্গে তিনি সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর আহ্বান জানান।
ঢাকা ট্যাক্স বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমান দুলাল বলেন, ''এবারের বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও করস্ল্যাব পুনর্বিন্যাসের ফলে কম আয়ের করদাতারা আগের তুলনায় কম সুবিধা পাচ্ছেন। আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম কর আরোপের কারণে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।''
এফবিসিসিআই-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, ''অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে কম আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ বাড়ানো সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।''
শিল্পখাতের ওপর নতুন করপ্রস্তাবের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ''রিলেটেড দুর্বল কোম্পানিকে আর্থিক সহায়তা দিলে দাতা কোম্পানির ওপর ৩ শতাংশ সুদ আরোপের প্রস্তাব শিল্পখাতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ তাদের টিকে থাকাকে আরও কঠিন করে তুলবে।''
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ট্যাক্স পলিসি বিভাগের সদস্য ব্যারিস্টার মোতাসিম বিল্লাহ ফারুকি বলেন, ''ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। এবারের বাজেটে কর-ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে করভিত্তি বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।'' তিনি আরও বলেন, করকে শুধু রাজস্ব আদায়ের মাধ্যম নয়, অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করসীমা নির্ধারণ এবং কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা ভবিষ্যতে প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়ানো, ভ্যাটের হার কমানো, করমুক্ত আয়ের সীমা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করা এবং বাজেট প্রণয়নে 'কর-ন্যায়বিচার মূল্যায়ন' বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেন। তারা মনে করেন, এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অটোমেশনের মাধ্যমেই কেবল কর ফাঁকি রোধ করা সম্ভব।
