নীতি ধারাবাহিকতার শক্ত বার্তা দিতেই বাজেটে ৫ বছরের করনীতি: বিডা চেয়ারম্যান
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে এবারের বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
তিনি বলেন, 'বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ সম্পর্কে দুটি বড় উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন—নীতি ধারাবাহিকতার অভাব এবং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে সরকার অন্তত নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার একটি শক্ত বার্তা বাজেটের মাধ্যমে দিতে চেয়েছে।'
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাজধানীতে 'বাংলাদেশ ইনভেস্টর বাজেট ব্রিফিং: ইনভেস্টমেন্ট-রিলেটেড বাজেট আউটকামস'- শীর্ষক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
বিডা চেয়ারম্যান বলেন, 'আমাদের কাছে নিয়মিতভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং গণমাধ্যম থেকে জানতে চাওয়া হতো, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় বাধা কী। তাদের প্রধান উদ্বেগ ছিল—বাংলাদেশে নীতির ধারাবাহিকতা নেই, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাও নেই।'
তিনি বলেন, 'বাজেট হলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, যার মাধ্যমে সরকার বিনিয়োগকারীদের কাছে নীতির ধারাবাহিকতার বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। তবে এই আস্থা একদিনে তৈরি হবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'আজ একটি সংকেত দেব, কালই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ চলে আসবে—বিষয়টি এমন নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আমরা একবার, দুবার, তিনবার একই ধরনের ধারাবাহিক বার্তা দিলে তখন বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করতে শুরু করবেন যে বাংলাদেশ সত্যিই যা বলছে, তা বাস্তবায়নে আন্তরিক।'
আশিক চৌধুরী বলেন, 'এবারের বাজেটে বিভিন্ন খাতে কর সুবিধার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতি অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।'
তিনি জানান, পাঁচ বছরের করনীতির রোডম্যাপ বাংলাদেশের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। ছয় মাস আগেও কেউ ভাবেনি যে সরকার পাঁচ বছরের করনীতি আগাম ঘোষণা করবে। আমাদের দেশ আগে কখনও এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত দিকনির্দেশনা দেয়নি। তাই এটিকে আমরা একটি 'টেস্ট কেস' হিসেবেও দেখছি।
তিনি বলেন, 'শূন্য থেকে পাঁচ বছরে আসাটাই বড় অগ্রগতি। ভবিষ্যতে এটি আরও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।'
জ্বালানি সংকট নিয়ে বিডা চেয়ারম্যান বলেন, 'জ্বালানি ও গ্যাস সংকট সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এই সংকটের রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়।'
তিনি বলেন, 'আমরা সবাই জানি সমস্যাটি কোথায় এবং সরকারও এটি নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, সেদিকেই গুরুত্ব দিতে হবে।'
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায়, সেটিও সরকার বিবেচনা করছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) এক বৈঠকে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়টি আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, 'অনেক বিনিয়োগকারী গ্যাস না পেলেও ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ করে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকারের বিভিন্ন সেবার ফি বা চার্জে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যায় কি না, তা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।'
বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
বিডা চেয়ারম্যান সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তিনি জানান, সম্প্রতি রাজশাহীতে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকে দেখা গেছে, অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রণোদনা বা ঋণ সুবিধা সম্পর্কেই জানেন না। এছাড়া একজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, কাস্টমস হাউসে নতুন নীতির সুবিধা চাইতে গেলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে তারা এখনও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা পাননি।
আশিক চৌধুরী বলেন, 'ডিজিটাল যুগে এটি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে নীতিগত সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো সময় লাগে।'
তিনি বলেন, 'এসব সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হবে এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত যেন দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।'
একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, 'আমি শুধু একটি বিষয় বলতে চাই। বাজেট, নীতির ব্যাখ্যা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) দৃষ্টিকোণ থেকে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নই মূল বিষয়।'
তিনি বলেন, 'আমরা সবাই বাস্তবায়নের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত। নীতি বা বাজেটের পদক্ষেপ যতই ভালো হোক না কেন, সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলেই কেবল কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে। এটি সরকারের অগ্রাধিকার এবং আমরা পুরোপুরি সচেতন যে সফল বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে এর সুফল ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছাবে কি না।'
