২৬ শতাংশ বাড়ল জলবায়ু বাজেট, কোন খাতে ব্যয় হবে অর্থ?
ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকার জলবায়ু বাজেট প্রস্তাব করেছে সরকার, যা আগের অর্থবছরের ৪১ হাজার ২০৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকার তুলনায় ২৫.৫৭ শতাংশ বেশি।
প্রস্তাবিত এই বরাদ্দ ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা তাদের সম্মিলিত বাজেটের ১১.০৩ শতাংশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় এ বরাদ্দ ব্যবহার করা হবে।
মোট প্রস্তাবিত বরাদ্দের মধ্যে ৩৮ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা বা ৭৫.২ শতাংশ রাখা হয়েছে জলবায়ু অভিযোজন (অ্যাডাপটেশন) কার্যক্রমের জন্য। এর আওতায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্বাসন, উপকূলীয় সুরক্ষা, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া ৯ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বা ১৯.২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রশমন (মিটিগেশন) কার্যক্রমের জন্য। এই অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বল্প-কার্বন পরিবহন ব্যবস্থা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসে ব্যয় করা হবে।
অবশিষ্ট ২ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা গবেষণা, জ্ঞান ব্যবস্থাপনা, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারের মতো আন্তঃখাতভিত্তিক কার্যক্রমে ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নয়ন বাজেটে জলবায়ু সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের অংশ বেড়ে ১৫.৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রতি সরকারের বাড়তি গুরুত্বের প্রতিফলন।
খাদ্য নিরাপত্তা ও অবকাঠামো খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনার (বিসিসিএসএপি) ছয়টি অগ্রাধিকার খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। মোট জলবায়ু বাজেটের ৪২.২৬ শতাংশ এ খাতে ব্যয় করা হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৪.৪৭ শতাংশ এবং প্রশমন ও স্বল্প-কার্বন উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় করা হবে ১৯.১৮ শতাংশ।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় মিলিয়ে মোট জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের ৫৩ শতাংশেরও বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে। এতে গ্রামীণ জীবিকা, কৃষি উৎপাদন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় সরকারের বিশেষ গুরুত্বের প্রতিফলন ঘটেছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট ৫২২টি জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার সম্মিলিত বরাদ্দ ৩৭ হাজার ১৩২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে অভিযোজন (অ্যাডাপটেশন) প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৭ হাজার ৬০৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং প্রশমন (মিটিগেশন) প্রকল্পে ৯ হাজার ৫২৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
বরাদ্দ বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অপর্যাপ্ত
জলবায়ু বাজেটের বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও দেশের জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় তা এখনও পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ এবং চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, প্রস্তাবিত জলবায়ু বরাদ্দ প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় নিলে প্রকৃত বৃদ্ধি অনেক কম।
তিনি বলেন, "বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর জিডিপির প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। কিছু ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সেই তুলনায় বর্তমান বরাদ্দ মোটেও যথেষ্ট নয়।"
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ), জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) এবং দেশের সবচেয়ে জরুরি জলবায়ু ঝুঁকিগুলোর সঙ্গে বর্তমান ব্যয় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এম জাকির হোসেন খান বলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ের কারণে অভিযোজন কার্যক্রম এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বড় আকারের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
জলবায়ু অর্থায়নে দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপের আহ্বান
এম জাকির হোসেন খান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য একটি সুস্পষ্ট জলবায়ু অর্থায়ন কৌশল ও রোডম্যাপ প্রয়োজন। এতে অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস, ব্যয়ের অগ্রাধিকার খাত এবং বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা উচিত।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) বাস্তবায়নে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে, দেশের সর্বশেষ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে জলবায়ু কার্যক্রম বাস্তবায়নে মোট ১১৬.১৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে ৯০.২৩ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
