বিনিয়োগ সংস্থাগুলোকে ধাপে ধাপে একীভূতকরণের সুপারিশ, প্রথমে এক হবে বিডা-পিপিপিএ
বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোকে একীভূত করার উদ্যোগ আপাতত ধাপে ধাপে এগোনোর সুপারিশ করেছে এ বিষয়ে গঠিত পর্যালোচনা কমিটি। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষকে (পিপিপিএ) একীভূত করার প্রস্তাব সামনে এসেছে।
বিনিয়োগ সংস্থাগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা ও সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির দ্বিতীয় সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। গত ২২ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে ছয়টি সংস্থা দেশে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে—বিডা, পিপিপিএ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) ও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ।
সভার অংশগ্রহণকারীরা এই সংস্থাগুলোকে এখনই একীভূত করার বিপক্ষে মত দেন।
সভা সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগ আকর্ষণমূলক কাজ যেহেতু মূলত বিডা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ করে, তাই প্রথম ধাপে এই দুই সংস্থাকে একীভূত করা যেতে পারে বলে কমিটি সুপারিশ করেছে।
সূত্র জানায়, এই একীভূতকরণের সাফল্য মূল্যায়ন করে পরবর্তী পর্যায়ে বেজা ও হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষকে একীভূত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এরপর অন্যান্য সংস্থার একীভূতকরণ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
এছাড়া বিসিকের অব্যবহৃত জমি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে একটি ধারণাপত্র পরবর্তী সভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়। বেজার আওতাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীদের জন্য রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল হিসেবে পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবও উঠে আসে।
একইসঙ্গে রপ্তানিমুখী অঞ্চলে কর অবকাশ ও অন্যান্য সুবিধা সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনায় এনে কিছু অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা বেপজার কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাবও আলোচিত হয়।
সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। কমিটির তৃতীয় সভা আগামী ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে; সেখানে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড-এর ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজ বিভাগের লিগ্যাল অফিসার কিয়োশি আদাচি বলেন, এই ছয় সংস্থাকে একীভূত করা ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'এই একীভূতকরণ যদি বাস্তবায়ন করা হয়, তবে প্রক্রিয়াটিতে বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যারা বৃহৎ শিল্প কার্যক্রম এবং ইপিজেড ও এপিআই পার্কের মতো ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবস্থা উভয়ের সাথে পরিচিত, তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বৈচিত্র্যময় চাহিদাগুলো কার্যকরভাবে মেটানোর জন্য একটি সমন্বিত সংস্থার অধীনে বিস্তৃত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জনবল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিকভাবে তিনি এই 'ওয়ান আমব্রেলা' উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি মনে করেন, যদি খাত-ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়, তবে এটি বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে সাহায্য করবে।
তবে বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট-এর (বিল্ড) চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বর্তমানে কার্যকর থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বেপজার অধীনে পরিচালিত দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকাগুলো (ইপিজেড) অত্যন্ত সফল। সেখানে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দক্ষতা ভালোভাবে কাজ করছে।
ঢাকা চেম্বার অভ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-র (ডিসিসিআই) সাবেক এই সভাপতি প্রশ্ন তোলেন: 'এত ভালোভাবে চলমান ও কার্যকর একটি ব্যবস্থাকে আমরা কেন নষ্ট করতে চাই?'
তিনি আরও বলেন, সংস্থাগুলোকে একীভূত করার প্রস্তাবের পেছনে সঠিক কারণ বা যুক্তিগুলো এখনও অস্পষ্ট। 'যদি সত্যিই উদ্দেশ্য হয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ব্যবসা সহজ করা, তবে তার জন্য যৌক্তিক ভিত্তি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে কাজ করছে, সেগুলোকে আরও শক্তিশালী করা উচিত, বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়।'
তিনি আরও বলেন, চলমান ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা নষ্ট করা উচিত নয়, কারণ এতে অর্জিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা হারানোর ঝুঁকি থাকে।
আবুল কাসেম বলেন, প্রস্তাবটি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তৃতীয় পক্ষের কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি বিশ্লেষণ করা হবে এবং সেই সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। এরপর ব্যবসায়ীসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা নীতিকে আরও কার্যকর করতে সাহায্য করতে পারে। 'যত বেশি মতামত পাওয়া যায়, তত বেশি আইডিয়া তৈরি হয়।'
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে এক ছাতার নিচে আনার পরিকল্পননা ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের।
সে সময় এ উদ্দেশ্যে একটি কেন্দ্রীয় ইনভেস্টমেন্ট প্রোমোশন এজেন্সি (আইপিএ) গঠনের প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছিল। তখন জানানো হয়, সংস্থাগুলোকে একীভূতকরণের বিষয়টি বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন হবে। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে ১৪ মার্চ এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে একীভূত করার উদ্যোগসহ অন্যান্য কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
বিডার নির্বাহী সদস্য ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট প্রধান নাহিয়ান রহমান রচি টিবিএসকে বলেন, সংস্থাগুলো একীভূত করার কাঠামোগত প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এটি ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার একটি 'মেজর এনাবলার' হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
