সঠিক রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমেই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা সম্ভব: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ 'ক্রসরোডে' [সন্ধিক্ষণে] অবস্থান করছে এবং সঠিক রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমেই দেশকে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
জোনায়েদ সাকি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি জাতীয় পুনর্গঠনের সময় অতিক্রম করছে, যা বহু আগেই রাজনৈতিকভাবে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকেই দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রবণতা শুরু হয়। পরবর্তীতে তা আরও শক্তিশালী হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর দিকে ধাবিত হয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রে নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতা চর্চার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় জনগণের মধ্যে জাতীয় পুনর্গঠন একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, কোনো ধারণা যখন সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, তখন তা রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়।
দেশের রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ধারাবাহিক আন্দোলনের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন জনগণের অংশগ্রহণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছে। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে নির্বাচিত করেছে এবং নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে—বিএনপি, গণসংহতি আন্দোলন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক জোটের বিভিন্ন সময়ে ঘোষিত ১৪ দফা, ২৭ দফা ও ৩১ দফা কর্মসূচি রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকেই প্রতিফলিত করে। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, গুম-খুন, মামলা-হামলা ও দমন-পীড়নের মধ্য দিয়েই এসব দাবি জনসমক্ষে এসেছে বলে তিনি জানান।
রাজনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, 'ক্রনি ক্যাপিটালিজম' বা গোষ্ঠীভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো রাষ্ট্রকে দুর্বল করেছে এবং সম্পদ পাচারের সুযোগ তৈরি করেছে।
সংস্কারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
জ্বালানি খাতে সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের প্রশংসা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংকটকে সুযোগে রূপান্তর করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ ইতিবাচক। এ পরিবর্তনকে তিনি 'যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত' হিসেবে অভিহিত করেন।
মাদক ও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার বিষয়ে তিনি বলেন, এসব সমস্যা কেবল আইন প্রয়োগ করে সমাধান করা সম্ভব নয়; এর জন্য গভীর সামাজিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে সাকি বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন ও ঘৃণার সংস্কৃতি পরিহার করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। অন্যথায় গণতান্ত্রিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, 'জুলাই জাতীয় সনদ' ও রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য অপরিহার্য। ঐকমত্য ছাড়া কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত দেশে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে না।
