চলতি বছর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শুল্ক যৌক্তিকীকরণে: ফাহমিদা খাতুন
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, চলতি বছরের সংস্কার কার্যক্রমে শুল্ক যৌক্তিকীকরণ বা ট্যারিফ র্যাশনালাইজেশনকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমদানি শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে দেশীয় রাজস্ব আদায় বাড়ানোর মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পরের পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তুত হওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
সম্প্রতি রাজধানীর রেনেসাঁ ঢাকা গুলশান হোটেলে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত 'উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য সহায়ক রাজস্ব নীতি' শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। ফাহমিদা খাতুন বলেন, 'আমার মতে, চলতি বছর শুল্ক যৌক্তিকীকরণকে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে হাতে নেওয়া উচিত।'
আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, 'আমাদের ক্রমশ নিজস্ব সম্পদের মাধ্যমে অর্থায়নের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে। তবে চড়া আমদানি শুল্ক এবং পরোক্ষ শুল্ক দিয়ে সেটি করা ঠিক হবে না। কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমরা এখনকার মতো বাণিজ্য সুবিধা বা শিথিল নিয়মকানুনগুলো আর পাব না।'
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভ্যাটের (মূসক) বহুদিনের ঝুলে থাকা সংস্কারের পাশাপাশি কর ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে শুল্ক যৌক্তিকীকরণ অত্যন্ত জরুরি। 'বছরের পর বছর আলোচনা হলেও ভ্যাট ব্যবস্থা এখনও অনেক জটিল রয়ে গেছে,' জানিয়ে তিনি আরও বলেন,
ভ্যাটের স্তর কমিয়ে এবং এর আওতায় আরও বেশি মানুষকে আনার মাধ্যমে ভ্যাট ব্যবস্থাকে সহজ করলে শুল্ক কমানোর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে এবং শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় বাড়বে। ভারতের উদাহরণ টেনে ফাহমিদা খাতুন জানান, সে দেশে ভ্যাটের হার সহজ করা এবং স্তর কমিয়ে আনার মাধ্যমে জিএসটির (পণ্য ও পরিষেবা কর) যৌক্তিকীকরণ করায় তাদের রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তিনি বলেন, 'আমাদেরও একটি সহজ ও কার্যকর ভ্যাট কাঠামোর দিকে এগিয়ে যেতে হবে।'
কর কাঠামোর বাইরে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা, বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় নিয়মিত পিছিয়ে থাকার দিকেও মনোযোগ আকর্ষণ করেন ফাহমিদা।
তিনি বলেন, 'এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি যেন একটা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, কিন্তু তা অপূর্ণই থেকে যায়।' এর পেছনের কারণ হিসেবে বাস্তবসম্মত অনুমানের বদলে রাজনৈতিক স্বার্থ বা চিন্তাভাবনা কাজ করে বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন এই অর্থনীতিবিদ। বর্তমানে বাজেটে প্রথমে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয় এবং পরে আয়ের ব্যবস্থা করা হয়, যার বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, 'সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোটাই আসল হওয়া উচিত। বাস্তবসম্মত সম্পদের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের বড় বড় লক্ষ্যগুলো স্থির করতে হবে।'
তিনি গণহারে কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ফাহমিদা খাতুনের মতে, জবাবদিহিতার অভাবে এগুলোর মাধ্যমে সরকারি কোষাগারের অর্থ অপচয় হচ্ছে। নতুন শিল্পকে সাহায্য করার জন্য প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন—এই কথা মেনে নিয়েও তিনি 'সানসেট ক্লজ' বা একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর প্রণোদনা বন্ধ করার নিয়মের অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, 'একবার কর ছাড় দেওয়া হলে, সেটি যেন চলতেই থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদেরও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত।'
তিনি কর খরচে আরও স্বচ্ছতার আহ্বান জানান। প্রণোদনা ও বিশেষ নিয়ন্ত্রক আদেশের (এসআরও) কারণে সরকারের ঠিক কত টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, তার তথ্য প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ফাহমিদা খাতুন বলেন, 'এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারকরা লাভ-ক্ষতির হিসাব বুঝতে পারবেন এবং রাজস্ব পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে তারা আরও আগে থেকেই সবকিছু হিসাব করে এগোতে পারবেন।'
আর্থিক খাতে সুশাসনের বিষয়ে ফাহমিদা বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাজেটের পর্যালোচনা করা উচিত, যাতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যায়।
তিনি বলেন, 'সংসদে মধ্যবর্তী পর্যালোচনা পেশ করা হলে কাজের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং সামনে কী হতে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে সবার পরিষ্কার ধারণা থাকবে।' তিনি মনে করেন, বিনিয়োগকারীরা শুধু প্রণোদনা নয়, বরং নীতির ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতাকেই বেশি মূল্যায়ন করেন।
ফাহমিদা খাতুন ভারতের মতো উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা বা পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে প্রণোদনা দেওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার পরামর্শ দেন। একইসঙ্গে তিনি এনবিআর-এর কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানান, যার মধ্যে রয়েছে কাজগুলোকে আরও স্বয়ংক্রিয় করা, কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর নীতি প্রণয়নকে এর প্রয়োগকারী বা প্রশাসনিক শাখা থেকে আলাদা করা।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জিন পেসমে এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তিনি বলেন, 'আমি ফাহমিদা খাতুনের তোলা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দিয়ে শুরু করতে চাই। প্রথমত, কর নীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করা খুবই জরুরি একটি কাজ। আগে এই সংস্কার না হওয়ার পেছনে হয়তো কোনো কারণ থাকতে পারে, কিন্তু এখন এটি অবশ্যই করতে হবে। কর ব্যবস্থায় সুশাসন ফেরাতে এবং ডিজিটালাইজেশন বা প্রযুক্তিনির্ভর কাজ এগিয়ে নিতে এই পৃথকীকরণ খুবই প্রয়োজনীয়।'
পেসমে আরও বলেন, 'দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি সুস্পষ্ট কর সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করা এবং কোনো পলিসি রিভার্সাল বা নীতি পরিবর্তন ছাড়াই তা বাস্তবায়ন করা। এই পরিকল্পনায় কী কী থাকা উচিত, তা আমরা আলোচনা করেছি। তবে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো কাজের দিকনির্দেশনা একদম পরিষ্কার থাকা এবং এটি যে সত্যিই কাজ করবে, তা প্রমাণের জন্য ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা।'
তিনি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, 'বিনিয়োগকারীদের প্রধান চিন্তার বিষয় হলো সরকারি নীতিগুলো বাস্তবে প্রয়োগ হবে কি না। আমি আজ একজন বিনিয়োগকারী হলে দুটি জিনিস জানতে চাইতাম—এটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য এবং আসলেই এর বাস্তবায়ন হবে কি না। তাই শুরুতে বড় বড় সংস্কারের বদলে ছোট পদক্ষেপ নিয়ে ঠিকমতো কাজ শুরু করা বেশি কার্যকর হতে পারে।'
সবশেষে জিন পেসমে বলেন, 'এখন আসল কাজ হলো এসবের বাস্তবায়ন। আমরা আশা করি আগামী বাজেটের আলোচনায় এর প্রতিফলন দেখা যাবে।'
