আমন ধানের দাম কমেছে, লোকসান চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছেন কৃষকরা
হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হতেই দেশের শস্যবাজারে তৈরি হয়েছে এক নীরব সংকট। কয়েক মাস আগেই আমনের রেকর্ড ফলনে উৎফুল্ল কৃষকরা এখন ধানের দামে ব্যাপক ধস দেখতে পাচ্ছেন। এতে এক লোকসান চক্রে আটকে পরেছেন তারা।
জানা যায়, ইতোমধ্যেই হাওরাঞ্চলে ধান কাটা শুরু হয়েছে। এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে উত্তরাঞ্চলেও পুরোদমে ধান কাটতে শুরু করবেন কৃষকরা। তবে গত এক মাস ধরে অস্বাভাবিকভাবে কমছে পুরনো আমন ধানের দাম।
কৃষকদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় এবার মানভেদে প্রতি মণ ধানের দাম ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার সতিহাটে এ সপ্তাহে স্বর্ণা-৫ জাতের ধান প্রতি মণ ১,১০০ থেকে ১,১২০ টাকা; জিরাশাইল ১,৩৯০ থেকে ১,৪৪০ টাকা এবং সম্পা কাটারী ১,৮৭০ থেকে ১,৯২০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। অথচ গত বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে স্বর্ণা-৫ জাতের ধান ১,৪৯০ থেকে ১,৫৪০ টাকা; জিরাশাইল ২,০০০ থেকে ২,১০০ টাকা এবং সম্পা কাটারী ২,১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।
নওগাঁ সদর উপজেলার ভীমপুর গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফা, যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত, বলেন, "গত বছর চৈত্র মাসে পুরনো ধান ১,৬০০ থেকে ১,৭০০ টাকা মণ বিক্রি করেছি। এবার সেটি ১,০০০ টাকায় নেমে এসেছে। অনেক কৃষক ধান বিক্রি করতে না পেরে হাট থেকে ফেরত আসছেন। গত ১৫ বছরে চৈত্র মাসে কখনো এমন দাম কমতে দেখিনি।"
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত আমন মৌসুমে ১ কোটি ৮১ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। অন্যদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়েছে, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি অর্থবছরেও ১১ লাখ ১৯ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে।
মিল, আমদানি ও বাজার পরিস্থিতি
চালকল মালিকরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ অটো রাইস মিল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও মালিক দেওয়ান মো. তানবীর টিবিএসকে বলেন, "ঈদের পর থেকে ধানের দাম কমছে। মিলগুলোতে এখনো আমন ধানের মজুদ রয়েছে। কৃষকদের কাছেও পুরনো ধান আছে। কয়েক মৌসুম ধরে ভালো উৎপাদন এবং বেশি আমদানির কারণে বাজারে সরবরাহ বেড়েছে।"
তিনি আরও বলেন, বর্তমান দামে চাল বিক্রি করলে লোকসান হওয়ায় মিলগুলো ধান কিনতে আগ্রহী নয়। ফলে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার রণচণ্ডী ইউনিয়নের কৃষক তোফায়েল আহমেদ স্বপণ বলেন, "ঈদের পর গত এক মাসে প্রতি মণ ধানে প্রায় ২০০ টাকা কমেছে। মিলগুলো এখন ধান কিনছে না। কৃষকদের কাছে আমনের অনেক ধান পড়ে আছে। বোরোতে প্রায় ৪৫০ মণ ধান উঠবে। তখন আমনের ধান বিক্রি করা আরও কঠিন হবে। গত বছর এ সময় প্রতি মণে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি ছিল।"
নওগাঁর সতিহাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, "আমনের শেষে ভেবেছিলাম জিরাশাইল ধানের ভালো দাম পাবো। কিন্তু বাজারে এসে দেখি, গত বছর যে ধান ২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি, সেটার দাম এখন ১,৪০০ টাকার বেশি কেউ দিচ্ছে না। জানলে আগেই বিক্রি করতাম। সার, বীজ, কীটনাশক—সবকিছুর দাম বেড়েছে। অথচ ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। তাই ধান বিক্রি না করেই বাড়ি ফিরছি।"
আরেক কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, "১,১২০ টাকা মণ দরে ৩০ মণ ধান বিক্রি করেছি। যেভাবে দাম কমছে, কিছুদিন পর ১,০০০ টাকাও থাকবে কি না সন্দেহ। সামনে আবার বোরো ধান উঠবে। আমনে ভালো ফলন হলেও চাল আমদানির কারণে আমরা বড় লোকসানে পড়েছি। এভাবে চললে ধান চাষ বন্ধ করে দিতে হবে।"
এদিকে পুরনো ধান বিক্রি করতে না পারলেও নতুন বোরো ধান কম দামে বাজারে আসতে শুরু করেছে। হাওরাঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ বোরো ধান কাটা হয়েছে এবং প্রতি মণ ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে—যা কৃষকদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
অতিরিক্ত সরবরাহের প্রভাব
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম টিবিএসকে বলেন, "আমাদের আমদানি করতে হয়। কিন্তু কখন এবং কী পরিমাণ আমদানি প্রয়োজন—তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত বিশ্লেষণ করা হয় না। সংকট তৈরি হলে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু আমদানি প্রক্রিয়া শেষ হতে হতে দেখা যায়, সংকট কেটে গেছে। তাই আমদানি প্রয়োজন কি না, হলে কখন ও কতটা—এসব বিষয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা জরুরি।"
তিনি বলেন, দাম কমলে কিছু পক্ষ লাভবান হলেও কৃষকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। "স্বাভাবিকভাবেই এখন বোরো ধান বাজারে আসবে। ফলে আমন ধানের দাম বাড়ার সুযোগ নেই। এতে কৃষকদের লোকসান গুনতে হবে এবং তারা লোকসানের চক্রে আটকে পড়বেন।"
নতুন ধানেও মিলছে না স্বস্তি
বোরো চাষিদের জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যে হাওরাঞ্চলে প্রায় ২০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। সেখানে কাঁচা ধান প্রতি মণ ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ি উপজেলার হাওরের কৃষক দীপ্র চৌধুরী বলেন, "খেত থেকেই প্রতি মণ ৭০০ টাকায় ধান বিক্রি করেছি। স্বাভাবিক সময়ে এটি ৮০০ টাকার বেশি থাকে। কিন্তু এবার দাম কম। জমিতে পানি উঠে গেছে, টানা বৃষ্টি হয়েছে। ডিজেলের খরচও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন কমবে, খরচ বাড়বে। এই দামে ধান বিক্রি করলে কৃষকদের বড় ধরনের লোকসান হবে।"
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া চৌমুহনি এলাকার কৃষক মামিনুল ইসলাম বলেন, "এবার ২৫ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছি। পুরনো ধানের দাম নেই, নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে। এই দামে খরচই উঠবে না। এই সময়ে অন্তত ১,২০০ টাকা মণ দর দরকার। সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ছে, কিন্তু ধানের দাম কমছে।"
একই এলাকার আরেক কৃষক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, "এভাবে চললে কৃষকদের গলায় দড়ি দিতে হবে। ঋণ নিয়ে চাষ করে সেই ঋণ শোধ করা যাচ্ছে না। লোকসান চলতে থাকলে জমি বিক্রি করতে হবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলেও কৃষকের দিকে নজর নেই। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।"
চাপের মুখে পুরো ব্যবস্থা
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকট শুধু কৃষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, "কৃষকদের কথা না ভেবেই সরকার ব্যবসায়ীদের অবাধে চাল আমদানির সুযোগ দিয়েছে, যখন দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন ছিল। গত এক মাস ধরে এর খেসারত দিচ্ছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বেচাকেনা কমে যাওয়ায় মিলারদের কাছে দেশীয় চালের বড় মজুত তৈরি হয়েছে। ফলে এক মাসে প্রতি কেজি চালের দাম মানভেদে ২ থেকে ৭ টাকা কমেছে। আর এক বছরে প্রতি মণ ধানের দাম ২৩০ থেকে ৬৬০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।"
তিনি বলেন, "যেসব কৃষক বেশি দামের আশায় ধান মজুত রেখেছিলেন, তারা এখন হাটে এসে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সামনে আবার বোরো ধান উঠবে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চালকল শিল্প বড় সংকটে পড়বে।"
"সরকারের সংগ্রহ অভিযান বাড়ানো না হলে এ শিল্প কর্পোরেটদের হাতে চলে যেতে পারে। কৃষকরা ন্যায্য দাম না পেলে চাষ কমিয়ে দেবেন, যার প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়বে," যোগ করেন তিনি।
বগুড়ার এক সিনিয়র বিপণন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "ভারত থেকে চাল আমদানির কারণে দেশের বাজারে ধস নেমেছে। ভারতীয় চাল তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। মিল মালিকদের গুদামে হাজার হাজার টন পুরনো ধান মজুত রয়েছে। বর্তমান দামে চাল উৎপাদন করলে তারা লোকসানে পড়বেন। তাই তারা ধান থেকে চাল উৎপাদন করছেন না—এটাই এখনকার বাস্তবতা।"
