চট্টগ্রামে স্বাধীনতা বইমেলায় বিক্রিতে মন্দা, প্রকাশকদের খরচও না ওঠার আশঙ্কা
নতুন বইয়ের ঘ্রাণে ভরা স্টল, সারি সারি প্রকাশনা আর হাতে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত দর্শনার্থী… সবই আছে চট্টগ্রামের স্বাধীনতা বইমেলায়। নেই শুধু একটি জিনিস—বই কেনার আগ্রহ।
সময় পরিবর্তনের কারণে চট্টগ্রামের স্বাধীনতা বইমেলায় বেচাকেনা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমেছে। দর্শনার্থীরা বইয়ের সঙ্গে ছবি তুলছেন, কিন্তু বই কিনছেন না। বর্তমানে বইমেলায় বই কেনার কয়েক দশকের সংস্কৃতি যেন হারাতে বসেছে।
গত ৩১ মার্চ শুরু হওয়া ১৯ দিনব্যাপী এই বইমেলা ইতোমধ্যে ১৫ দিন পার করেছে। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এক বাস্তব চিত্র—প্রত্যাশিত বিক্রি নেই, জমে ওঠেনি বেচাকেনা। ফলে অংশগ্রহণকারী প্রকাশক ও বিক্রেতাদের মধ্যে বাড়ছে লোকসানের শঙ্কা।
চসিকের আয়োজনে ও চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের ব্যবস্থাপনায় এবার মেলায় ৪০ হাজার বর্গফুটের সুবিশাল জিমনেসিয়াম মাঠজুড়ে মোট ১২৯টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডাবল স্টল ৩৫টি এবং সিঙ্গেল স্টল ৯৪টি। চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকার সৃজনশীল অভিজাত প্রকাশনী সংস্থাগুলোও মেলায় অংশ নিয়েছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ মোট ১১২টি প্রকাশনা সংস্থা মেলায় অংশ নিয়েছে। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং ছুটির দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
ছুটির দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও তাদের অনেকের লক্ষ্য বই কেনা নয়—ঘুরে বেড়ানো আর ছবি তোলা। বইয়ের পাতার গন্ধ ছাপিয়ে এখন যেন ক্যামেরার ক্লিকই বেশি শোনা যায়—ফ্রেমে বন্দী হওয়ার আগ্রহই যেন সবার বেশি। কেউ স্টলে উঁকি দিচ্ছেন, বই উল্টেপাল্টে দেখছেন, আবার মোবাইলে ছবি তুলছেন—কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেনাকাটা হচ্ছে খুবই কম।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যানন্দ প্রকাশনী। তাদের স্টলে তৈরি করা হয়েছে একটি ভাঙাচোরা, ধুলোমাখা লাইব্রেরির প্রতিচ্ছবি—যেখানে বই আছে, কিন্তু পাঠক নেই। ধুলোমাখা তাক, ছেঁড়া বই আর নিঃসঙ্গ পরিবেশ যেন নীরবে এক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—'আমরা কি সত্যিই বই পড়ছি?'
বিদ্যানন্দ প্রকাশনীর একজন বিক্রেতা বলেন, প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ এই প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বই কেনা এবং বইয়ের প্রতি পাঠকদের আগ্রহ বাড়ানো জরুরি। চট্টগ্রামের এই আয়োজন তাই শুধু একটি বইমেলা নয়—এটি আমাদের বর্তমান পাঠাভ্যাসের এক প্রতিচ্ছবি।
২০২৪ সালে ৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পাঠকের ওপর বিশ্বের ১০২টি দেশে একটি জরিপ চালানো হয়। সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এই জরিপ অনুযায়ী, বই পড়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পেছনের দিকে—৯৭তম। একজন বাংলাদেশি বছরে গড়ে বই পড়েন মাত্র ২.৭৫টি এবং বই পড়ায় বছরে সময় ব্যয় করেন মাত্র ৬২ ঘণ্টা।
অনলাইনের যুগে সবাই ফোনে সময় ব্যয় করছেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে একজন মানুষ দিনে প্রায় ৫ ঘণ্টা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে—যা একদিকে প্রকাশনা শিল্পে সংকট তৈরি করছে, অন্যদিকে বই পড়ার সংস্কৃতিকেও বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্টলে বিক্রেতারা অলস সময় পার করছেন। বেচাকেনা কিছু হলেও আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন তারা।
নওশিন নামের একজন পাঠিকা বলেন, কাজের ব্যস্ততার কারণে বইমেলায় আসা হয় না। এছাড়া অনলাইনের যুগে পিডিএফ সহজেই পাওয়া যায়, আর রকমারি থেকে অর্ডার করলে ডিসকাউন্টে বই পাওয়া যায়।
তিনি আরও জানান, আগের মতো নতুন বইয়ের প্রতি আকর্ষণ নেই। যদি নতুন লেখকদের মানসম্মত বই মেলায় নিয়মিত পাওয়া যেত, তাহলে আসার আগ্রহ বাড়ত।
বইমেলায় বিকেলের পর ভিড় বাড়ে। বিভিন্ন স্কুল থেকে শিক্ষার্থীরা আসে, তারা ঘুরে দেখে, কিন্তু বই কেনার আগ্রহ কম। হালিশহর আহমেদ মিয়া স্কুলের সামিয়া নামের একজন শিক্ষার্থী বলেন, বই কেনার জন্য আলাদা বাজেট না থাকায় সে বই কিনতে পারছে না।
'ক্রিডস বুক' নামের একটি স্টলে শিশুদের বই বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতা অধীর দাস জানান, বাচ্চাদের বইয়ের ক্ষেত্রে আগের মতোই মোটামুটি সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
আবির প্রকাশনীর বিক্রেতা উসামা বলেন, বেচাকেনা নেই বললেই চলে। ২০১৯ সাল থেকে স্টল দিচ্ছি। ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভালো বিক্রি ছিল। কিন্তু এবার সময় পেছানোর কারণে পাঠকদের আগ্রহ কমে গেছে। ১৪ দিনে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০-২১ হাজার টাকা, যেখানে লাখ টাকার ওপরে বিক্রির আশা ছিল।
বাতিঘর প্রকাশনী শুরু থেকেই মেলায় অংশ নিচ্ছে। বিক্রেতা বাবলু চৌধুরী জানান, ১৪ দিনে প্রায় ৫০ হাজার টাকার বিক্রি হয়েছে, যা খরচের তুলনায় লোকসান। ২-৩ লাখ টাকার বিক্রির আশা ছিল তাদের। তিনি বলেন, অনেক বই অনলাইনে সহজলভ্য হওয়ায় সরাসরি মেলায় সাড়া কম। এছাড়া এপ্রিলের তীব্র গরমও একটি বড় কারণ।
আয-যিহান প্রকাশনীতে গিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এক বিক্রেতা বলেন, এই মেলা মূলত প্রকাশনীগুলোর প্রচারের জায়গা। অনেক স্টলে সব ধরনের বই রাখা হয়, ফলে নির্দিষ্ট বই চাইলে অনেক সময় পাওয়া সম্ভব হয় না।
অক্ষরবৃত্ত প্রকাশনীর বিক্রেতা মুমু জানান, সময় পিছিয়ে যাওয়ায় এবং অনেকের পরীক্ষা থাকায় পাঠক কম এসেছে। আগে প্রতিদিন গড়ে ৮০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হলেও এবার ১৪ দিনেও দেড় লাখ টাকা হয়নি। এবার তাদের ৬০টি নতুন বই বের হয়েছে। তবে এলিজাবেথ বিনতে এলাহীর লেখা 'দেখা অদেখা চট্টগ্রাম' বইটির দাম ১৬০০ টাকা, যা সাধারণ পাঠকের নাগালের বাইরে বলে তিনি মনে করেন।
হাওলাদার প্রকাশনী ২০১৯ সাল থেকে অংশ নিচ্ছে। প্রকাশক সেলিম হাওলাদার বলেন, এবার বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা, যেখানে কয়েক লাখ টাকার আশা ছিল।
'অনন্যা' স্টলে হুমায়ূন আহমেদের বই বিক্রি হচ্ছে। এক বিক্রেতা জানান, ৭০ হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়েছে, তবে লক্ষ্যমাত্রা ছিল অন্তত দেড় লাখ টাকা। প্রথমা প্রকাশনে ১৪ দিনে বিক্রি হয়েছে প্রায় ১ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় কয়েক গুণ কম।
পাঞ্জেরি, কথা প্রকাশ, মূর্ধন্যসহ অনেক স্টলের বিক্রেতারা জানান, বিক্রি খুব একটা হবে না জেনেও তারা ঐতিহ্যের খাতিরে মেলায় এসেছেন। তাদের মতে, বইমেলা ফেব্রুয়ারিতে হওয়াই সার্থক। সময় পেছানো, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং মানসম্মত বইয়ের অভাব—এসব কারণে পাঠক কম।
এই চিত্র শুধু চট্টগ্রামে নয়, ঢাকার অমর একুশে বইমেলাতেও কিছুটা দেখা গেছে। প্রকাশনায় যুক্ত কবি কাজী আবু তাহের বলেন, দর্শনার্থীরা এখন বই কেনার চেয়ে ছবি তুলতেই বেশি আগ্রহী। মানুষ বই থেকে ক্রমেই বিমুখ হয়ে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি বই পড়ছি, নাকি বইকে শুধু ছবি তোলার পটভূমিতে পরিণত করছি? আধুনিকতার ছোঁয়ায় বই পড়ার চিরায়ত সংস্কৃতি কি তবে হারানোর পথে?
