আইন সংশোধনের মাধ্যমে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সাবেক মালিকরা
অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় প্রণিত 'ব্যাংক রেজ্যুলেশন অর্ডিনেন্স' সংশোধনের মাধ্যমে বর্তমানে পুনর্গঠনাধীন সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর ওপর সাবেক মালিকদের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছে।
সংশোধনীটি বিশেষভাবে পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—যেগুলোকে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের অংশ হিসেবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে একীভূত করা হচ্ছিল।
শুক্রবার সংসদে পাস হওয়া নতুন বিধান অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করে তাদের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরায় অধিগ্রহণ করতে পারবেন। এতে নবগঠিত সম্মিলিত ব্যাংক ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সংকটাপন্ন পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে চারটি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল, আর এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে।
নতুন এই সংশোধনী নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি ব্যাংক খাত সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করছে এবং আর্থিক সংকটের জন্য দায়ীদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
মালিকানা ফিরে পাওয়ার শর্ত
১৮ক ধারা সংযোজনের মাধ্যমে অধ্যাদেশটি সংশোধন করেছে সরকার। এই ধারায় বলা হয়েছে, রেজোলিউশনের তালিকাভুক্ত কোনো ব্যাংকের আগের মালিকরা ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনঃঅধিগ্রহণের জন্য রেজোলিউশন কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন।
পুরনো মালিকদের ফিরতে হলে আবেদনের সঙ্গে আলাদা একটি অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। এতে উল্লেখ করতে হবে, তারা সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সব অর্থ পরিশোধ করবে, নতুন মূলধন যোগান দেবে এবং বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে।
এছাড়া তারা আগের সব আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ করবে, সরকারের কর ও রাজস্ব পরিশোধ করবে, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন করবে।
আবেদন মঞ্জুরের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই-বাছাই করে সরকারের অনুমোদন নেবে। আবেদন চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের তিন মাসের মধ্যে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত অর্থের অন্তত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ পে-অর্ডার দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
অনুমতি দেওয়ার পর দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কার্যক্রম তদারকি করবে। এরপর একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে শর্ত পালনের বিষয়টি তদন্ত করা হবে। ব্যর্থতা ধরা পড়লে অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করা যাবে।
'বাজারভিত্তিক সমাধান' হিসেবে সরকারের ব্যাখ্যা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই উদ্যোগকে "ন্যায্যতা, সাম্যতা ও বিনিয়োগ সুরক্ষা"র দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে একে 'মার্কেট সলিউশন' বা 'বাজারভিত্তিক সমাধান' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
জাতীয় সংসদে বিল পাসের সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে দুর্বল ব্যাংক খাতে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং সামনে আরও প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমান আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বড় আর্থিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে সরকারের পক্ষে বহন করা কঠিন।
তার ভাষায়, নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীদেরই মূলধন পুনঃস্থাপন, দায় পরিশোধ এবং আগে দেওয়া সহায়তা ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে। ফলে সরকার বা আমানত সুরক্ষা তহবিলের ওপর চাপ কমবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, "এর মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। ব্যাংকের সম্পদ ও দায় পুনর্গঠন করে দ্রুত কার্যক্রম চালু করা গেলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তা সহায়ক হবে।"
তিনি আরও বলেন, "মালিকানা পুনর্বহালের সুযোগ দিলে নির্দোষ সাধারণ শেয়ারধারীদের আর্থিক স্বার্থ পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হবে। এটি ন্যায্যতা, সাম্যতা ও বিনিয়োগ সুরক্ষার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।"
একই সঙ্গে তিনি এটিকে 'বাজারভিত্তিক সমাধান' হিসেবে তুলে ধরে বলেন, সরকারি হস্তক্ষেপের বদলে বেসরকারি উদ্যোগ ও পুঁজি সংযোজনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, এই নতুন ব্যবস্থা শুধু আগের শেয়ারধারীদের জন্য নয়; বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপযুক্ত বিবেচিত অন্য পক্ষও এতে আবেদন করতে পারবে।
সম্পদের মূল্য সংরক্ষণের যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, "সরাসরি লিকুইডেশনে গেলে সম্পদের মূল্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু ব্যাংক সচল রেখে পুনর্গঠনের সুযোগ থাকলে সম্পদের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য অনেকটাই সংরক্ষণ করা সম্ভব।"
এছাড়া, কর্মসংস্থান নিয়ে বলেন তিনি, ব্যাংক সচল থাকলে কর্মচারীদের চাকরি এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কার্যক্রমও চালু থাকবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকায় বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংক খাত সংস্কারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত টাস্কফোর্সের সদস্য ড. জাহিদ হোসেন বলেন, "এক বছরের বেশি সময় ধরে পাঁচটি ব্যাংক রেজোলিউশনের মাধ্যমে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কাজ চলছিল। একীভূত প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেক উন্নয়ন সহযোগীর সম্পৃক্ততাও ছিল। এখন নতুন ধারা যুক্ত করে বিল পাস করার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আগের মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক টিকবে না।"
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর আগের মালিকরা যদি শর্ত অনুযায়ী ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দেয় এবং পরবর্তী দুই বছরে বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধে রাজি হয়, তাহলে ব্যাংকগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
তিনি আরও বলেন, "যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই অর্থের পরিমাণ হবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রথম তিন মাসের মধ্যে দিতে হবে এবং বাকি অর্থ পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধ করতে হবে। এমন সহজ শর্তে আগের মালিকরা অবশ্যই তা বাস্তবায়নে রাজি হবে।"
জাহিদ হোসেন বলেন, "পুরনো মালিকরা এখন ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে দুই বছরের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ অর্থ ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে পারবে।"
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক টিকবে কি না—এমন প্রশ্নে জাহিদ হোসেন বলেন, আগের মালিকরা বা নতুন যারা পাঁচটি ব্যাংকের মালিকানায় আসবে, তাদের সিদ্ধান্তের ওপরই ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।
তিনি বলেন, "তারা যদি মনে করেন আগের মতো পাঁচটি ব্যাংক আলাদাভাবে পরিচালনা করবেন, তাহলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আর টিকবে না। আর যদি সবাই মিলে একটি ব্যাংক হিসেবে পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে এটি টিকে থাকতে পারে।"
