ইরান যুদ্ধে ব্যাহত সালফার সরবরাহ, সালফিউরিক অ্যাসিডের দাম বেড়েছে ৮-১০ গুণ
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সালফারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে দেশের চামড়া, ব্যাটারি ও সার শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে।
তেল শোধন প্রক্রিয়ার উপজাত সালফার এবং এর রাসায়নিক যৌগ সালফিউরিক অ্যাসিডের ওপর নির্ভরশীল এসব শিল্পের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এ জটিলতায় ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদনকারী বেসরকারি খাতের একটি কারখানাসহ টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের প্ল্যান্ট।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ স্থগিত থাকায় রাসায়নিক শিল্পে সালফারের ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সালফিউরিক অ্যাসিডের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে এর দাম স্বাভাবিকের তুলনায় ৮ থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
কাঁচামাল সংকটের কারণে গত ৩ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে ফরিদপুরে অবস্থিত বেসরকারি খাতের সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এএ রসায়ন শিল্প লিমিটেড।
প্রতিষ্ঠানটির সেক্রেটারি রাশেদ আহমেদ জানান, মূলত কাঁচামাল সংকটের কারণেই তাদের কারখানা বন্ধ রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে এ সংকট; ফলে বিকল্প রুটে সালফার আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এএ রসায়ন শিল্প লিমিটেডের দৈনিক সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ মেট্রিক টন।
কেমিক্যাল ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন বলেন, "কারখানাগুলো থেকে মালই পাচ্ছি না। এতে আমরাও ভোগান্তিতে আছি। সরকারি প্রতিষ্ঠান সালফারের জন্য বন্ধ থাকায় তারা বাইরে অ্যাসিড দিচ্ছে না। আর যেসব কোম্পানি চালু আছে, তারা সময়ে সময়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।"
তিনি বলেন, "আগে যেখানে সালফিউরিক অ্যাসিডের কেজি ছিল ৩৮ টাকা, সেটি এখন প্রতি টন ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এত দাম সত্ত্বেও অ্যাসিড পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।"
এদিকে, যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামাল সংকটের কারণে গত বছরের নভেম্বর থেকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) আওতাধীন টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন প্ল্যান্টও বন্ধ রয়েছে।
তবে প্ল্যান্ট বন্ধ থাকলেও কাঁচামাল সংকট যেন টিএসপি সার উৎপাদনে প্রভাব না ফেলে, সে জন্য ফসফরিক অ্যাসিড আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে হাতে থাকা মজুদ থেকে বিসিআইসির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সালফিউরিক অ্যাসিড সরবরাহ করা হচ্ছে, তবে সেই মজুদও প্রায় শেষের দিকে।
টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেন সুখেন চন্দ্র বলেন, "মূলত যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আপাতত প্ল্যান্টটি বন্ধ রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছি। তবে মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিসিআইসির আরেক প্রতিষ্ঠান বিআইএসএফএল তৈরি করে থাকে। গত ১২ মার্চ তাদের পারচেজ অর্ডার দেওয়া হয়েছে, তারা জানিয়েছে এগুলো তৈরি করতে তিন মাস সময় লাগবে। এছাড়া সেখানে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের হাতে কাঁচামালও নেই। বর্তমানে যে কাঁচামাল আছে, তা দিয়ে মাত্র আট দিন কারখানা চালানো সম্ভব।"
"কাঁচামাল বিসিআইসি থেকে কেনা হয়, কিন্তু একাধিকবার টেন্ডার করেও ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। এজন্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমরা স্থানীয়ভাবে টেন্ডার আহ্বান করেছি। পাশাপাশি পুরোনো প্ল্যান্টের পরিবর্তে নতুন প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।"
সালফার ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিআইসির ক্রয় বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেরনিয়াবাত রেজাউল বারী মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আমদানিতে বিঘ্ন
সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদনের পাশাপাশি সালফার রাসায়নিক সার, দিয়াশলাই ও ওষুধ শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
এনবিআরের প্রকাশিত আমদানি স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, দেশে গত বছরের ডিসেম্বরে সালফার (সব ধরনের, সাবলাইমড, প্রিসিপিটেটেড ও কলোয়েডাল সালফার ব্যতীত) আমদানি হয়েছিল ২,২২৪.২৭ টন—যার অ্যাসেস ভ্যালু ছিল ৯৯,২৭৪,৪৩১ টাকা।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমদানি হয় ৩,৪১২ টন—যার অ্যাসেস ভ্যালু ছিল ২১২,১৯৬,২৮৬ টাকা এবং ফেব্রুয়ারিতে এটি ছিল ২,৪১৮ টন—যার অ্যাসেস ভ্যালু ছিল ১৫৩,৪২৬,০২৫ টাকা।
তবে মার্চের স্টেটমেন্টে কোনো সালফার আমদানির উল্লেখ নেই।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ট্রেড ডাটা বিশ্লেষণকারী প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে সালফার রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে শীর্ষে ছিল সৌদি আরব, যেখানে দেশটির অংশ ছিল অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ ছাড়াও ভারত থেকেও কিছু পরিমাণ সালফার আমদানি করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশে সালফার রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে চীন, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়ার নামও রয়েছে। রাশিয়াকে সালফারের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখান থেকে আমদানি করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, দেশে সালফার আমদানিকারকদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বিসিআইসি, ক্রিসেন্ট কেমিক্যালস, ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেড ও এ এ রসায়ন শিল্প লিমিটেড। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ক্রিসেন্ট কেমিক্যালস।
যোগাযোগ করা হলে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি শামসুল হক বলেন, "কিছুদিন ধরেই সালফার আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে সরবরাহ বন্ধ, আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকেও লোড করা যাচ্ছে না। ফলে সংকট ও দাম—দুটোই বেড়েছে।"
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সচল থাকলেও নিজস্ব চাহিদা বেশি, বিশেষ করে ফিটকিরি তৈরিতে। ফলে বর্তমানে যে পরিমাণ সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন করা হচ্ছে, তা নিজেদের প্রয়োজনেই ব্যয় হচ্ছে।
চাপে রয়েছে শিল্প
অ্যাসিড ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারের চাহিদার তুলনায় সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। মোট চাহিদার বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সরবরাহ মিলছে।
টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড প্রাইভেট সেক্টরে সালফিউরিক অ্যাসিড সরবরাহ বন্ধ করার পর বাজারে প্রথম অস্থিরতা শুরু হয়। তখন কেজিপ্রতি দাম ২০-২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫-৪০ টাকায় পৌঁছায়।
পরবর্তীতে যুদ্ধ শুরু হলে দাম ৬০ টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং বর্তমানে অ্যাসিড উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো এক গাড়ি (১০ টন) অ্যাসিড ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছে।
বাংলাদেশ অ্যাসিড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. কবির হাসান টিবিএসকে বলেন, "সরকারি টিএসপি কমপ্লেক্সের বাইরে বড়জোর চারটি প্রতিষ্ঠান সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন ও সরবরাহ করে। এর মধ্যে এ এ রসায়ন শিল্প লিমিটেড বন্ধ রয়েছে।"
তিনি বলেন, "স্থানীয় বাজারে এর দাম সাধারণত ২০-২৫ টাকার মধ্যে থাকে। টিএসপি কমপ্লেক্সের প্লান্ট বন্ধ হওয়ার পর তা ৩৫-৪০ টাকায় ওঠে। পরে আমরা দাম কমার অপেক্ষায় থাকলেও যুদ্ধ শুরুর পর সালফার সংকটের অজুহাতে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়িয়ে ২০-২১ লাখ টাকায়ও এক গাড়ি বিক্রি করেছে (১০ টন)।"
জে. কো. ব্যাটারি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের হেড অব সেলস এ কে এম জহিরুল হাসান টিবিএসকে বলেন, "এই সংকট ঈদের আগ থেকেই শুরু হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে আমরা ১০ টন সালফিউরিক অ্যাসিড ২.৭০ লাখ টাকায় কিনতাম, অর্থাৎ লিটারপ্রতি ২৭ টাকা। সেখানে গত ২ এপ্রিল প্রতি টন ২৫০ টাকা দরে কিনতে হয়েছে।"
তিনি বলেন, ব্যাটারি শিল্পে সালফিউরিক অ্যাসিড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। ফলে এই সংকটে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
এবিএস ট্যানারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমাম হোসাইন টিবিএসকে বলেন, "কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রথম ধাপেই সালফিউরিক অ্যাসিড প্রয়োজন হয়। মাসে অন্তত ৫ টন অ্যাসিড লাগে আমাদের। ফেব্রুয়ারির শেষেও আমরা ৪৩ টাকা দরে কিনেছি, যা এখন ২২০ থেকে ২৪০ টাকায় পৌঁছেছে।"
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, "রোজার ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি চামড়া আসে। ৩৫ টাকার অ্যাসিড এখন ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অনেক সময় পাওয়াও যাচ্ছে না। ফলে ট্যানারিগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খরচও বেড়ে যাচ্ছে।"
