মনোনয়ন না দেওয়ায় বিএনপিকে ধন্যবাদ জানালেন রুমিন ফারহানা
দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য বিএনপিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য (স্বতন্ত্র) রুমিন ফারহানা।
তিনি বলেন, 'আমাকে মনোনয়ন না দেওয়ার কারণেই আমি বুঝতে পেরেছি বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কত লক্ষ মানুষের ভালোবাসা, দোয়া, সহযোগিতা আমার পাশে ছিল। একটা দলীয় গণ্ডির মধ্যে থেকে নির্বাচন করলে এইটা বুঝবার সৌভাগ্য আমার হতো না।'
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এসময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদে সভাপতিত্ব করছিলেন।
এসময় তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, 'সঙ্গতভাবে আমাদের এক্সপেক্টেশন ছিল এবার রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত ভাষণের বাইরে গিয়ে তার নিজের মতো করে সংসদে ভাষণ দিতে পারবেন। কিন্তু আমরা দেখলাম এবারও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত একটি ভাষণ দিতে হলো। আমরা যদি এতটুকু স্বাধীনতা রাষ্ট্রপতিকে দিতে না পারি, তাহলে আর আমরা কোন ভারসাম্যের কথা বলছি?'
তিনি বলেন, 'গত ১৫ বছরে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে, যার পরিমাণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব মতে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, সেটি ফেরত আনা না গেলে কিংবা ব্যাংক খাতে থাকা ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা না গেলে; অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কোনো পরিবর্তন কাজে আসবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'গত ১০ বছরে ওভার অ্যান্ড আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ৬৮ বিলিয়ন ডলার। সুতরাং এই মিথ্যা ইনভয়েসিং বন্ধ করা না গেলে টাকা পাচারও বন্ধ সম্ভব না।'
রুমিন ফারহানা বলেন, 'রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রয়ত্ব ও বেসরকারি ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বিক তদারকি, উন্নতকরণ, আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।'
তিনি বলেন, 'যেকোনো দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এটি সরকারের ব্যাংক হিসেবে কাজ করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রিন্সটন বা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পিএইচডি করা উচ্চ ডিগ্রিধারী অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোকজন নিয়োগ পেয়েছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'অন্যদিকে বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠনের পর যিনি নিয়োগ পেয়েছেন, তিনি বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং একজন সোয়েটার ফ্যাক্টরির এমডি। একই ঘটনা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও দেখেছি। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ভিসি- প্রভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।'
এই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বলেন, 'দল করা দূষণীয় কিছু নয়। কিন্তু দল না করলে যদি নিয়োগ না হয়, সেটা দুর্ভাগ্যজনক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলে যাচ্ছে দলদাস শিক্ষকদের হাতে।'
রুমিন ফারহানা বলেন, 'আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বলি, এই আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে ছিলেন নারীরা। নতুন প্রজন্মের একঝাঁক তরুণ মুখ আমরা পেয়েছিলাম। সেই নারীরা এক বছর পার না হতেই হারিয়ে গেলেন কেন? সাতজন নারী সাংসদের এই সংসদে সেই প্রশ্নটা আমি আপনাদের কাছেই রেখে যাচ্ছি।'
তিনি বলেন, 'মিছিলের সামনের সারিতে নারীর প্রয়োজন হয়। পুলিশের টিয়ারশেল- লাঠিচার্জের সামনে নারী ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। অস্থির সময় নারীর সাহায্য ছাড়া পার হওয়া যায় না। আর সবকিছু যখন ঠিক হয়, তখন নারী হয়ে যায় ট্রোলের বস্তু। নারীর পোশাক, নারীর চেহারা, নারীর কথা, নারীর হাসি- সবকিছুই তখন হাসির খোরাকে পরিণত হয়।'
তিনি আরও বলেন, '৫২ শতাংশ মানুষকে পেছনে ফেলে নতুন বাংলাদেশ রচনার কোনো চিন্তা যদি কেউ করে থাকে, সেটা কখনো সম্ভব না। কোনোদিন সম্ভব না।'
রুমিন ফারহানা বলেন, 'হাজার মানুষের আত্মত্যাগের ফসল হচ্ছে আজকের এই সংসদ। এই মানুষগুলো কারা? তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজকে কেউ মন্ত্রী, কেউ এমপি, কেউ সরকারি দল, কেউ বিরোধী দলের হয়ে সংসদে এসে বসেছি। তাদের স্বপ্ন কী ছিল? তারা জানতো এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে তাদের কেউ কিন্তু মন্ত্রী হবে না, এমপিও হবে না। তারা ছিল সাধারণ মানুষ, বাংলাদেশের একেবারে খেটে খাওয়া সাধারণ জনগণ।'
তিনি বলেন, 'তারা একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন, একটা নতুন বাংলাদেশ তৈরির স্বপ্ন, একটা নতুন রাজনীতি নির্মাণের স্বপ্ন, একটা নতুন চিন্তার জন্ম দেওয়ার স্বপ্ন। সর্বোপরি সবার জন্য যে ভীষণ রকম বৈষম্য আমরা দেখেছি গত কয়েক বছর, সেখান থেকে মুক্ত হয়ে সবাইকে নিয়ে একটা বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই সব মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।'
